Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইতিহাস. Show all posts

Thursday, 4 February 2021

অহিংসা

 আজ চৌরিচৌরা ঘটনার শতবর্ষ।

না, এটা সমারোহর সঙ্গে পালন করার মতো কিছু না। এ ছিল কিছু মানুষের নির্মম মৃত্যু, হয়ত তারা অত্যাচারী শাসকের নির্দেশ পালন করছিল। কিন্তু তাই বলে তাদের জ্বলন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার কোন মানে ছিল না। বড়ই নিন্দনীয় ঘটনা। কিন্তু তাই বলে কি একটি সমগ্র উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন তার সামনে বলি দেওয়া যায় ?!



লোকজন গান্ধীজীকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। কিন্তু দেবতারও কি ভুল হয় না? এ কি গুরুপাপে লঘুদণ্ড ছিল না? বারবার এ প্রশ্ন মনে এসেছে, তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করতে পারি।
কেন বারবার গোটা বিশ্বে civil society movement গুলোতে গান্ধীকে এইভাবে স্মরণ করা হয়। কারণ ভদ্রলোক যে রাস্তাটা দেখিয়েছিলেন, তা যেকোন গণতান্ত্রিক দেশে আন্দোলনের সর্বোত্তম পন্থা। যখন গোটা পশ্চিমা বিশ্ব একে অপরকে নির্দয় ভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল, ইউরোপে গণতন্ত্র বিপন্ন, ফ্যাসিবাদের উত্থান, তখন সভ্য ভাবে আন্দোলনের এক রাস্তা দেখিয়েছিলেন তিনি।

আমার কাছে গান্ধির প্রথম পরিচয় একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। আর রাজনৈতিক নেতার কর্মপদ্ধতি তাকে সেরা বানিয়ে তোলে, বলে আমার মত। ঠিক যেমন একজন বিজ্ঞানীর শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করি তার কাজের পদ্ধতি দিয়ে। গ্যালিলিও বা নিউটনের থিওরি দিয়ে আজকালকার দিনে বিজ্ঞানের অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু তবুও তাদের কাজের কথা লোকজন স্মরণ করে তাদের কর্মপন্থার জন্য, উদ্ভাবনী ভাবনার জন্য। আর গান্ধীজী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য যে পন্থা গুলো দেখিয়েছিলেন, তা আজও পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে একটা অস্ত্র – সে ধর্না হোক কি অনশন কি আইনঅমান্য।

হ্যাঁ, তাঁর আন্দোলনের ইস্যু গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে ধর্মীয় ইস্যুকে (খিলাফত) মিলিয়ে দেওয়া কিংবা শাসকের বিপদের (দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ) সময় আন্দোলন না করা – কিন্তু কর্মপন্থা যে সেরা এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। যতক্ষণ একটা আন্দোলন অহিংস থাকে, ততক্ষণ তার প্রতি জনগণের সহানুভুতি থাকে, আর তাতে আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণও বাড়ে। হিংসাত্মক আন্দোলনে সচরাচর যুক্ত হতে সাধারণ মানুষের মনে ভয় করে, কারণ কেই বা চায় বলুন প্রাণ হারাতে।

এই যে যেমন দেখুন, দেশজোড়া কৃষক আন্দোলন। ধরুন আপনি যদি আর্থিক উদারীকরণের পক্ষে হন, আন্দোলনের ইস্যুগুলোকে আপনার গ্রহণযোগ্য নাও মনে হতে পারে, কিন্তু দুমাস ধরে দিল্লির হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় রাস্তায় পড়ে থেকে আন্দোলন দেখে আপনার মনে সহানুভুতি জেগেছিল। তবে যেই ২৬শে জানুয়ারি আন্দোলনে হিংসার ছোঁয়া লাগল সঙ্গে সঙ্গে নানা মহল থেকে তির্যক প্রশ্নবাণ ধাওয়া করলো। অনেক আন্দোলনকারীর উৎসাহেও ভাঁটা পড়েছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।



এইখানেই বুঝতে পারা যায় গান্ধিজির আন্দোলনের পন্থার গুরুত্ব কতটা। কেন তিনি কয়েকজন পুলিশ কর্মীর মৃত্যুতে গোটা আন্দোলন তুলে নিয়েছিলেন। কেন মার্টিন লুথার কিং থেকে নেলসন ম্যন্ডেলা গান্ধীকে পাথেও বলে মানেন। ভারতে গণতন্ত্র আসার আগেই, এরকম এক অভিনব পথ দেখিয়েছিলেন, তিনি অবশ্যই যুগের থেকে এগিয়ে ছিলেন বলতে হয়। আর তখনই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। আজ যখন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র আঘাত পাচ্ছে, দিকে দিকে populist নেতাদের প্রভাব বাড়ছে, উগ্র দক্ষিণপন্থার কালো মেঘ উঁকি দিচ্ছে, তখন বোধহয় গান্ধীকে আরও বেশি করে প্রয়োজন।

Thursday, 19 July 2018

সেলফি কথা

আজকাল সেলফি তোলার খুব হিড়িক। অনুষ্ঠান থেকে বন্ধুদের সাথে আউটিং, সেলফি না তুললে আপনি ঠিক আধুনিক হতে পারলেন কই। শুধু তুললেই হবে না, ঘটা করে সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করতে হবে।
অক্সফোর্ড ডিকশনারির ২০১৩ সালে ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার হওয়া সেলফি শব্দের সংজ্ঞা হল  “a photograph that one has taken of oneself, typically one taken with a smartphone or webcam and uploaded to a social media website.
বোঝ কান্ড, তার মানে এমনি সাধারণ ক্যামেরা দিয়ে নিজেই নিজের ছবি তুললে সেটা গ্রাহ্য হবে না। তাহলে সেটাকে কি বলব? উত্তর হল, সেটাকে বলব photographic self-portrait। সে যা যা বলুক গে, আমরা আপাতত নিজেই ছবি নিজের ছবি তোলাকে সেলফি বলে ধরে নিই তাহলে বিশেষ কিছু ক্ষতি হবে না। তো মাঝে মধ্যেই মনে প্রশ্ন জাগে যে প্রথম সেলফি কে তুলেছিল। 
কর্নেলিয়াসের তোলা প্রথম সেলফি 


অধিকাংশের মতে প্রথম সেলফি তুলেছিলেন রবার্ট কর্নেলিয়াস। উত্তর আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার এক অ্যামেচার রসায়নবিদ ছিলেন এই কর্নেলিয়াস। তো ১৯৩৯ সালের একদিন তিনি, তার বাড়ির দোকানের পিছনে ক্যামেরা বসিয়েছেন। কিন্তু ছবি তোলার জন্য কাউকে পাচ্ছেন না। শেষে নিরুপায় হয়ে নিজেই লেন্স ক্যাপ খুলে ক্যামেরার সামনে এক মিনিট বসে থাকলেন, তারপর লেন্স ক্যাপটা লাগিয়ে দিলেন। ডেভেলপ করার পর দেখলেন তার ছবি এসেছে। ছবির পিছনে আবার লিখলেন “The first light Picture ever taken. 1839.”
কর্নেলিয়াসে তোলা দ্বিতীয় সেলফি 







এই ছবি তোলার পরেও কর্নেলিয়াস আরেকটি ছবি তুলেছিলেন নিজের। সেটা প্রথম ছবি তোলার চার বছর পর। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে কর্নেলিয়াস তার রসায়নগারে একটি বোতল ও একটি বিকার থেকে কিছু তরল ফানেলের মাধ্যমে অন্য একটি  বিকারে ঢালছে। এই ছবিটায় কর্নেলিয়াসের মুখ খুন একটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না অবশ্য।





এরপর একটু বাংলায় ফিরে আসি। বাংলায় প্রথম সেলফি কে তুলেছিল তা নিয়ে মতভেদ আছে। স্পষ্ট করে কেউ কিছু জানে না। তবে সত্যজিৎ রায় তার যুবক বয়সে ক্যামেরার শাটারের সাথে সুতো বেঁধে তার মায়ের সাথে একটি ছবি তুলেছিলেন। অনেকে এটাকে বাংলায় প্রথম photographic self-portrait বলে দাবি করেন। 

সত্যজিৎ রায়ের তোলা photographic self-portrait
এরপর আসি মহাকাশে। মহাকাশে প্রথম সেলফি তোলেন বাজ অলড্রিন। ১৯৬৬ সালে জেমিনি ১২ অভিযানে তিনি মহাকাশে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা হাঁটার পর এই সেলফি তোলেন।

মহাকাশে প্রথম সেলফি 
এতক্ষন তো গেল মানুষে সেলফি তোলার কথা, শুনেছেন বাঁদরে সেলফি তুলেছিল। আজ্ঞে হ্যাঁ সত্যি। শুধু তাই নয় সেই সেলফির স্বত্বাধিকার নিয়ে মামলা পর্যন্ত হল।
তো হয়েছিল কি, ২০১১ সালে ইংল্যান্ডের ফটোগ্রাফার ডেভিড স্লটার ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিলেন বন্যপ্রাণীদের ছবি তুলতে। সেখানে তিনি ছবি তুলতে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে ভুলেই যান তাঁর আরও একটি ক্যামেরার কথা। ডেভিডের অন্যমনস্কতার সুযোগ নিয়ে নারুতো নামে এক ম্যাকাক বাঁদর ক্যামেরাটি নিয়ে খেলতে শুরু করে। একগাদা ছবিও তোলে বাঁদরটি। তার বেশির ভাগ ঝাপসা হলেও নিজের ঝাঁ চকচকে সেলফি তুলতে ভুল করেনি বাঁদরটি। এরপর বহু কায়দা করে ডেভিড তার ক্যামেরাটি হাতে পান। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল সব কিছু।
এরপরে ‘ওয়াইল্ডলাইফ পার্সোনালিটিজ ‘নামক এক গ্রন্থে বাঁদরের সেলফিটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উইকিপিডিয়ার প্রকাশক উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন তাদের ওয়েবসাইটে এই অভিনব সেলফি প্রকাশ করে এবং ছবিটি নিয়ে হইচই পড়ে যায়। এখনও পর্যন্ত মানুষ ব্যাতীত অন্যকোনও প্রাণীর সেলফি এই প্রথম। ফলে স্বভাবতই এই নিয়ে উৎসাহ চরমে পৌঁছায়। কিন্তু উইকিমিডিয়ার উপর বেজায় চটেগেলেন ডেভিড। তার দাবি এই ছবির কপিরাইট তার। উইকিমিডিয়ার ওয়েবসাইট থেকে পৃথিবীর একমাত্র বাঁদরের সেলফি সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেলন তিনি। মামলা গড়াল কপিরাইট আদালত অবধি। ডেভিডের যুক্তি, ‘ফটোগ্রাফি খুবই খরচসাপেক্ষ একটি শিল্প। ২০১১-তে ইন্দোনেশিয়া গিয়ে ছবি তুলতে গিয়ে আমার দু’হাজার ডলারের বেশি খরচ হয়েছিল। এ ছবির মালিক আমি। কারণ, ক্যামেরা আমার। বাঁদর শুধু ক্লিক করেছিল। ওই ছবিটির জন্য তিন বছরে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার লাভ করতাম। সে সুযোগ বঞ্চিত হয়েছি’। অপরদিকে উইকিপিডিয়া ডেভিডের যুক্তি মানতে নারাজ। উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষের যুক্তি হচ্ছে, সেলফি তুলেছে বাঁদরটি নিজে। তাই এই ছবির কপিরাইটে ডেভিডের কোনো অধিকার নেই।
শেষ পর্যন্ত উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষের জয় হয়। কপিরাইট আইনে কোনও ছবির মালিকানা তাঁর উপর বর্তায় যিনি ক্যামেরার শাটার ক্লিক করেছেন। এক্ষেত্রে কিন্তু কাজটি করেছে ম্যাকাক বাঁদরটি স্বয়ং। অতএব সে যতদিন না এসে কপিরাইট দাবি করছে ততদিন সম্ভবত নিশ্চিন্তে থাকতে পারে উইকিপিডিয়া।

বাঁদরের তোলা সেই সেলফি 


এরপর আরেকটি মামলা করে পশুপ্রেমিক সংগঠন পেটা। তাদের দাবি, ওই সেলফি-র কপিরাইট ম্যাকাক বাঁদরটির।
যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, ফটোগ্রাফার শুধু ক্যামেরাটি রেখেছিলেন। কিন্তু সেলফি তোলার কৃতিত্ব ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ সুলাওয়েসির ৬ বছরের ম্যাকাক মাঙ্কি নারুতোর। তাই ওই ছবি থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় অর্থ নারুতো ও ওই সংরক্ষিত অরণ্যে বসবাসকারী তার প্রজাতির অন্যান্যদের জন্য ব্যয় করার আর্জি জানিয়েছে পেটা। এই মামলার রায়েও ডেভিড হেরে যান, আদালত রায় দেয় ওই সেলফিটি থেকে বা সেটিকে বিক্রি করে যা আয় তিনি করেছেন তার ২৫ শতাংশ ওই প্রজাতির বাঁদরের সংরক্ষণে ব্যয় করতে হবে।
বেচারা ডেভিড, কে জানত একটা ছবির জন্য এতো ঝামেলা হবে তার।

Thursday, 12 July 2018

হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানী - এত্তেরিও মাইয়োরানা

২৫শে মার্চ ১৯৩৮, ইতালির পালেরমো থেকে নেপলস যাওয়ার পথে জাহাজ থেকে একজন বিজ্ঞানী হারিয়ে যান। জাহাজে তাকে উঠতে দেখা গেলেও নামতে কেউ দেখেনি। অনেক খোঁজ করেও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি তার। অথচ তিনি থাকলে নোবেল প্রাইজ ছিল তার হাতের মুঠোয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাকে অনেক খুঁজেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। কিন্তু কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি তার। কোথায় গেলেন তিনি ?
 
*********



ইউরোপ তখন উত্তাল, বিশ্ব জোড়া আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছে সমস্ত দেশ। বেকারত্ব হুহু করে বাড়ছে। সেই সুযোগে দেশে দেশে মাথাচাড়া দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ।
এই সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা প্রযুক্তির উন্নতির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরেছেন। তারা চাইছিলেন উন্নত প্রযুক্তি। যা যুদ্ধে ও দেশে শিল্পের উন্নতিতে সহায়ক। তাই পদার্থবিদ্যা ও প্রযুক্তিবিদ্যার গবেষণা এই সময় এক উচ্চতায় পৌঁছয়। 

এই সময়, ১৯৩২ সালে আইরিন জোলিও কুরি ও ফ্রেদরিক কুরি গামা রে নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের মনে হচ্ছিল পরমাণুর ভেতরে নিউক্লিয়াসে প্রোটন ছাড়াও আরেকটি অজানা কোন কণা আছে। কিন্তু তাদের আগেই এই কণার ধারণা দিয়েছিলেন এনরিকো ফার্মির ছাত্র, অনামী এক বিজ্ঞানী। ফার্মি তাকে বলেছিলেন সেই নিয়ে একটি গবেষণা পত্র লিখতে কিন্তু তিনি তা গুরুত্ব দেননি। পরবর্তীকালে সেই অনামী কণা (নিউট্রন) আবিষ্কারের জন্য নোবেল পান জেমস চ্যাডউইক। কিন্তু তখন কে জানত পরের কয়েক দশকে এই অনামী বিজ্ঞানীই হয়ে উঠবেন আলোড়ন ফেলে দেওয়া সবচেয়ে রহস্যময় ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। কে তিনি ?


**********

তিনি এত্তেরিও মাইয়োরানা। তার সম্পর্কে এনরিকো ফার্মি বলেছিলেন - "পৃথিবীতে অনেক ধরণের বিজ্ঞানী আছেন। কেউ দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর, যারা তাদের সেরাটা দিয়ে থাকে, কিন্তু তাতেও বেশি দূর যেতে পারে না। তারপর আসে প্রথম শ্রেণীর বিজ্ঞানী, যাদের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। কিন্তু তারও পরে থাকেন জিনিয়াসরা, যেমন নিউটন ও গ্যালেলিও। তাদের মধ্যেই একজন হলেন মাইয়োরানা।"

এত্তরিও মাইয়োরানা



অসম্ভব প্রতিভাবান ছিলেন এই ইতালিয় পদার্থবিদ, গণিতেও অসাধারণ দক্ষতা। ১৯০৬ সালের ৫ই অগস্ট, সিসিলির ক্যাটনিয়ায় জন্ম। তার কাকা কুইরিনো মাইয়োরানা পদার্থবিদ ছিলেন। সেই কাকার থেকেই তার পদার্থবিদ্যা ও গণিতে আগ্রহ জাগে তার। ১৯২৩ সালে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়া শুরু করলেও ১৯২৮ সালে এমিলিও সেগ্রের অনুরোধে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি এনরিকো ফার্মির অ্যাটমিক স্পেক্ট্রোস্কপি তত্ত্বকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করে গবেষণা পত্র লিখেছিলেন। সেই গবেষণা পত্র পড়ার পর একসাথে গবেষণা করার জন্য তাকে ডেকে নিয়েছিলেন এনরিকো ফার্মি।

এরপর ফার্মির পরামর্শে ১৯৩৩ সালে তিনি জার্মানির লিপজিগ যান, সেখানে ন্যাশানাল রিসার্চ কাউন্সিলের থেকে অনুদান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সেখানেই তার সাথে আলাপ হয় হাইসেনবার্গের সাথে। সেখানে মেজেরানা নিউক্লিয়াসের উপর গবেষণা শুরু করেন। এরপর তিনি কোপেনহেগেন যান, সেখানে তার সাথে পরিচয় হয় নীলস বোরের। 

সেই সময়ই নাৎসি পার্টি জার্মানির ক্ষমতায় আসে। অনেক খ্যাতনামা গবেষক ইহুদি হওয়ার জন্য তাদের জার্মানি ছাড়তে হয়। অরাজকতার সবে আরম্ভ হয়েছে। এদিকে মাইয়োরানা স্নায়বিক দুর্বলতা ও গ্যাস্ট্রাইটিসের সমস্যায় ভুগছেন। সব কিছু মিলিয়ে তার জার্মানিতে বসবাস দুঃসহ হয়ে উঠছিল। বাধ্য হয়ে জার্মানি ছাড়েন তিনি এবং রোমে ফিরে আসেন।
খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের জন্য তার শরীর আরও ভেঙ্গে পড়তে লাগল। তার বিজ্ঞান গবেষণার কাজও অনেকটা থমকে গেছিল। প্রায় টানা চার বছর সন্ন্যাসীর মতো নিজেকে সমস্ত কিছু থেকে সরিয়ে রাখেন। সামান্য কয়েকটি গবেষণা পত্র লিখেছিলেন এই সময়ে। অধিকাংশই ছিল অপ্র
কাশিত। 
এরপর ১৯৩৭ সালে তিনি আবার গবেষণা শুরু করেন। ইউনিভার্সিটি অফ নেপলসে ত্বাত্তিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এই সময় তিনি তার শেষ গবেষণাপত্রটি লেখেন। ইলেকট্রন ও তার অ্যান্টি পার্টিকেল পজিট্রনের ওপর। এই ম্যাটার আর অ্যান্টি ম্যাটারের ওপর কাজটিই তার শেষ প্রকাশিত কাজ ছিল।কিন্তু তারপরই দুম করে হারিয়ে গেলেন তিনি। আর সেই যে গেলেন তো গেলেন, কেউ তার খোঁজ পেল না।



**********

দিনটা ছিল ২৫শে মার্চ ১৯৩৮ সাল, পালেরমো থেকে নেপলস যাচ্ছিলেন তিনি। ওই দিনই তাকে শেষ দেখা গেছিল। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে তিনি পালেরমোতে কি করতে গেছিলেন?

কেউ বলেন তিনি এমিলিও সেগ্রের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন। কিন্তু এমিলিও সেগ্রে তখন ক্যালিফোর্নিয়াতে ছিলেন। তার পক্ষে ইতালি আসা অসম্ভব ছিল। কারণ সেই সময় মুসোলিনি এমন একটি আইন তৈরী করেন যার ফলে প্রবাসী ইহুদিরা দেশে ফিরতে পারতেন না। ইহুদি এমিলিও সেগ্রের তাই তখন ইতালিতে থাকার কথায় নয়।
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে পালেরমো যাওয়ার আগে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে সমস্ত টাকা তুলে নেওয়া হয়। তবে কি তিনি পরিকল্পিত ভাবে অন্তর্হিত হয়েছিলেন ?
আবার ওই ২৫ শে মার্চেই তিনি নেপলস ফিজিক্স ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা আন্তেনিয় কারেলি একটা চিঠি পাঠান। চিঠির বক্তব্য অদ্ভুত ও অস্পষ্ট। তাতে মাইয়োরানা বলেছিলেন -

প্রিয় কারেলি

                  আমি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি যেটা কোন মতেই এড়ানো যাচ্ছিল না। এর মধ্যে বিন্দুমাত্র স্বার্থপরতা নেই আমার, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি আমার এই হঠাৎ অন্তর্ধানের সিদ্ধান্তের ফলে তোমার এবং ছাত্রদের অনেক অসুবিধা হবে। গত কয়েক মাসে তুমি আমায় সহানুভূতি ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলে, আমাকে বিশ্বাস করে ছিল, তার সমস্ত কিছুর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য আমার ক্ষমা করো। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, আমার কথা সবাইকে মনে করানোর জন্য, যাদের আমি জানতে পেরেছি তোমার ইন্সটিটিউটে এসে। আমিও তাদের সবাইকে মনে রাখব আজ রাত ১১টা পর্যন্ত, আর সম্ভব হলে তার পরেও। 

                                                                                                               ইতি            এত্তেরিও মাইয়োরানা


 এই চিঠি দেখেই কেউ কেউ মনে করেন মাইয়োরানা বোধহয় আত্মহত্যা করেছেন। কারণ রাত ১১টার উল্লেখ দেখে মনে হতেই পারে ওই দিন রাত ১১টার পর আর তিনি বেঁচে থাকেন নি।
কিন্তু অনেকেই আবার মনে করেন তিনি আত্মহত্যা করার মতো মানুষ ছিলেন না। আর যদি আত্মহত্যাই করেন তবে ব্যাঙ্ক থেকে সমস্ত টাকা তুলে নেবেন কেন? আসলে তিনি নিজে থেকেই অন্তর্হিত হয়েছিলেন।
এত্তেরিও মাইয়োরানার নিখোঁজ সংবাদ, ইতালিয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত



এত্তেরিও মাইয়োরানাকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে? এই নিয়ে খবর বেরিয়েছিল ১৯৩৮ সালে ১৭ জুলাই লা ডোমিনিকা দেল কোরিয়ে নামক ইতালিয় সংবাদপত্রে
তার এই অন্তর্ধান সম্পর্কে ফার্মি বলেন, "এত্তেরিও খুব বুদ্ধিমান। সে যদি নিজেই গা ঢাকা দিয়ে থাকে তবে তাকে খুঁজে বের করতে কেউ পারবে না।"
কেউ কেউ মনে করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বন্দি করে। সেই সময় বেনিটো মুসোলিনি নিজে এই রহস্য সমাধানে উদগ্রীব হন। এমনকি মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেন। পুরস্কার মূল্য ধার্য্য হয় ৩০ হাজার লিরা। কারণ অবশ্য তখন একটাই। সব দেশ তখন পরমাণু অস্ত্রের খোঁজ চালাচ্ছে। আর অনেকেই মনে করেন মাইয়োরানার যা বুদ্ধিমত্তা, তা দিয়ে তিনি পরমাণু বোমা বানাতে পারেন।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পরেও এফবিআই তাকে পাগলের মতো খুঁজেছে। এই সন্দেহে যে, কোন দেশ বা সংস্থা তাকে দিয়ে পরমাণু বোমা বানাচ্ছে কি না। । কিন্তু সব কিছুই ধোঁয়াশা।

এরপর ১৯৭৫ সালে ইতালিয় লেখক লিওনার্দো শাশা, মাইয়োরানার অন্তর্ধান সম্পর্কে একটি বই লেখেন। সেখানে তিনি দাবি করেন এত্তেরিও মাইয়োরানা আর্জেন্টিনা চলে যান। সেখানে গিয়ে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বাকি জীবন কাটান। কিন্তু এমিলিও সেগ্রে এই মত খারিজ করে দেন। তাদের মতে এত্তেরিও মাইয়োরানা আত্মহত্যা করেছিলান।

 



*********

এত্তেরিও মাইয়োরানার অন্তর্ধানের ৭০ বছর পর  ২০০৮ সালে একটি অবাক করা ঘটনা ঘটে। ইতালিয় টেলিভিশনে 'কি লা'হ ভিস্তো' (কে একে দেখেছে) নামক একটি অনুষ্ঠান হত। সেখানে একটি পর্বে এত্তেরিও মাইয়োরানার সম্পর্কে বলা হচ্ছিল। হঠাৎ একটি ফোন আসে। ফ্রান্সেস্কো ফাসানি নামক এক ব্যাক্তি দাবি করে বসেন তিনি মাইয়োরানাকে দেখেছেন। ফাসানি বলেন, তিনি ১৯৫৫ সালে ভেনেজুয়েলা যান। সেখানে তিনি তার সিসিলিয়ান বন্ধু সিরোর সাথে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে ভ্যালেন্সিয়া যান। সেখানে কার্লো নামক এক আর্জেন্টিনিয় ভদ্রলোকের মাধ্যমে মিঃ বিনি নামে এক ব্যাক্তির সাথে আলাপ হয়। বিনি ছিল  শুভ্রকেশযুক্ত এক ভদ্রলোক, অনেকটা রাজপুত্রের মতো দেখতে লাগছিল। সে ছিল অন্তর্মুখী ও উদাসী মানুষ। তার কথায় রোমান টান ছিল। আরও যে ব্যাপারটা ফাসানিকে আগ্রহী করেছিল, সেটা হল বিনি হাতঘড়ি পরেছিল জামার হাতার ওপরে, সচারাচর ঘড়ি হাতার নীচে থাকে। কিন্তু সম্ভ্রান্ত রোমান পরিবারে হাতার ওপর ঘড়ি পরা ছিল একটি রীতি। উল্লেখযোগ্য হল মাইয়োরানার ঠাকুরদাদা এক সময় ছিলেন ইতালির কৃষি মন্ত্রী এবং মাইয়োরানারা বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল।
ফ্রান্সেস্কো ফাসানি ভেনেজুয়েলাতে গাড়ির মেকানিক হিসেবে কাজ করতো। বিনির একটি হলুদ রঙের স্টুডবেকার গাড়ি ছিল। কিন্তু ফাসানির মতে বিনি এতটাই গরিব ছিল, যে তার মনে হয়ে ছিল বিনির কাছে শুধু গাড়িতে গ্যাসোলিন ভরার টাকাই আছে। গাড়ি সারাবার খরচের মতো টাকা নেই। তো ফাসানি সেই গাড়ির মধ্যে কিছু কাগজপত্র দেখতে পান। সেই কাগজ পত্রের মধ্যে ১৯২০ সালে কুইরিনো মাইয়োরানার লেখা একটা পোস্টকার্ড ছিল, যেটা না কি W.G. নামক কোন এক আমেরিকানকে লেখা। এছাড়া ফাসানি একটি নোটবই পান, যেটা নাকি বিভিন্ন অঙ্ক ও ফর্মুলায় ভর্তি ছিল।
এরপর কার্লো তাকে বলেন, এই বিনি আসলে হলেন বিজ্ঞানী মাইয়োরানা। কার্লোর সাথে বিনির নাকি আর্জেন্টিনায় দেখা হয়েছিল। তখন ফাসানি বিনির সাথে একটি ছবি তুলতে চান। কিন্তু বিনি নারাজ। এরপর একদিন বিনি ১৫০ বলিভার ধার চায় ফাসানির কাছে, তখন ফাসানি তার বদলে বিনির সাথে ছবি তুলতে চায়। পরবর্তীকালে ফাসানি ছবিটিকে অতটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু টিভিতে মাইয়োরানাকে নিয়ে দেখাতে তার মনে পড়ে সবকিছু ও সে ফোন করে জানায় টেলিভিশন অফিসে। এই ঘটনার পরে ইতালিতে শোরগোল পড়ে যায়।  মাইয়োরানার কেসটি নতুন করে খোলা হয়। আবার অনুসন্ধান শুরু হয়।
বাম দিকে ফ্রান্সেস্কো ফাসানির সাথে ডান দিকের ব্যাক্তিটি ইত্তেরিও মাইয়োরানা বলে দাবি করা হয়

অনেকেই এই ছবিটি দেখে এনাকে মাইয়োরানা বলেন, কারণ ডান পাশের ব্যাক্তিটির সাথে এত্তেরিও মাইয়োরানার বাবার বৃদ্ধ বয়সের ছবির সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেছিল। সব মিলিয়ে যা দাঁড়িয়ে ছিল তা হল, এই যে, মাইয়োরানা ১৯৫৫ সালের কিছু আগে আর্জেন্টিনা থেকে ভেনেজুয়েলা যান। কিন্তু কেন আর্জেন্টিনা গেছিলেন, সেখান থেকে কেনই বা ভেনেজুয়েলা গেছিলেন তা জানা গেল না।


*********

এইসব ঘটনার দু বছর পর  ২০১০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ বলোনে-র অধ্যাপক জর্জো দ্রাগোনি নতুন কিছু তথ্য তুলে ধরেন।  তিনি এত্তেরিও মাইয়োরানার অন্তর্ধানের ওপরে অনুসন্ধান করছিলেন। তিনি সাইমন উইজেন্থালের একটি বই, 'জাস্টিস, নট রিভেঞ্জ' (১৯৯৯) এর থেকে ছবি দেখান।
জর্জো দ্রাগোনি
ছবিটি ১৯৫০ সালে তোলা হয়েছিল। ছবিটির ক্যাপশান ছিল 'নাজি হান্টার অ্যান্ড দা হলোকাস্ট সারভাইভার।' যেখানে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে বুয়েনস আইরিস গামী একটি জাহাজে। সেখানে মাঝের ভদ্রলোকটিকে নাৎসি সেনানায়ক অ্যাডলফ ইচম্যান বলেছিলেন সাইমন উইজেন্থাল। কিন্তু পাশের দুজনের পরিচয় ছিল না। এখন দ্রাগোনি একপাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোককে এত্তেরিও বলে দাবি করছেন।
মাঝখানে মাথায় টুপি পরে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি অ্যাডলফ ইচম্যান, আর ছবির বামদিকে কালো চশমা পরে যিনি তাকেই এত্তেরিও মাইয়োরানা বলে দাবি করা হয়


সেই ছবির সাথে এত্তেরিওর ছবির সম্পূর্ণ মিল পাওয়া যায়। সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি তথ্য স্পষ্ট হয় যে এত্তেরিও মেজেরানা আর্জেন্টিনা চলে গেছিলেন।
এই একই ছবি থেকে ইত্তেরিও মাইয়োরানার  কথা ২০১০ সালের ১৭ অক্টোবর 'লা রিপাবলিকা' নামক ইতালিয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সেখানেও ছবির বামদিকের ব্যাক্তিকে মাইয়োরানা বলা হয়। 'লা রিপাবলিকা' সংবাদপত্রের সাংবাদিক জোসেফ বরেলো ও আরও দুই তরুণ সাংবাদিকের সাথে একটি বই লিখেছেন, লা সেকন্দা ভিতা দি মাইয়োরানা (মাইয়োরানার দ্বিতীয় জীবন)।
 


*********


ইত্তেরিও কিভাবে হারিয়ে গেলেন, কোথায় গেলেন এই রহস্যের আজও সমাধান হয়নি। আরেক ইতালিয় সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলো প্যারাটিকা দাবি করেন তিনি আর্জেন্টিনাতেই থেকে যান, সেখানে পাদ্রীর কাজ করতেন। তিনি ভেনেজুয়েলা যাননি। আবার কেউ কেউ দাবি করেন ৮০-র দশকে তাকে রোমের রাস্তায় দেখা গেছে। কিন্তু তিনি কোথায় তা সম্পর্কে নিশ্চিত কেউ কিচ্ছু বলতে পারেনি।

লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের অধ্যাপক জোয়াও ম্যাগুইজো এই নিয়ে অনেক অনুসন্ধান করেন। তিনি ইত্তেরিওর বাড়ি গিয়েও তদন্ত করেন, সেখান থেকে তিনি কিছু অপ্রকাশিত গবেষণা পত্র পান। যযার মধ্যে ছিল কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স এর ওপর গবেষণা। যে কাজের জন্য ১৯৬৫ সালে নোবেল পান রিচার্ড ফাইনম্যান।
যদি সত্যি সত্যি তিনি তার সমস্ত গবেষণা প্রকাশ করতেন তবে তিনি একাধিক নোবেল পেতে। জেমস চ্যাডউইক থেকে রিচার্ড ফাইনম্যান- এদের সবার আগেই গবেষণায় এগিয়ে ছিলেন এত্তেরিও মাইয়োরানা। এনরিকো ফার্মি কোন ভুল বললেননি , এত্তেরিও মাইয়োরানা ছিলেন সত্যিকারের এক জিনিয়াস।
                                                               

Sunday, 20 May 2018

ভ্রান্ত ধারণার ইতিহাস

এই বছর কার্ল হাইনরিশ মার্ক্সের জন্মের ২০০ বছর পূর্ণ হল। এই বিপুল সময়ে গোটা বিশ্বে অনেক পরিবর্তন এসেছে, সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হয়েছে, মুক্ত অর্থনীতির জোয়ার লেগেছে সারা বিশ্বে। তবুও মার্ক্সের বক্তব্য গুলির প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। তবে এই সময়ে মার্ক্সের কথার অপব্যাখ্যার সংখ্যাও বেড়েছে। অবশ্য মার্ক্স জীবিত থাকতেই তার কথা গুলির ভুল ব্যাখ্যা শুরু হয়ে গেছিল। আজও বহু লোক মার্ক্সকে ভুল ব্যাখ্যা করেই চলেছেন। তার পাশাপাশি চলে আসছে তার সম্পর্কে কিছু মিথ, বলা ভাল গুজব। তার মধ্যে একটি হল মার্ক্স নাকি বলেছিলেন, তিনি মার্ক্সবাদী নন। অনেকে এই ধারণা বিশ্বাস করেন। যেমন মার্কিন নাট্যকার হাওয়ার্ড জিন তার 'Marx in Soho' নাটকে দেখিয়েছিলেন - মার্ক্স বলছেন, ‘আমি নিজেই কি মার্ক্সবাদী?' তখনও একইরকম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। 
কিন্তু আসল ঘটনাটা সম্পূর্ণ আলাদা। মার্ক্স-বিশেষজ্ঞ হাল ড্রপার-এর  'Karl Marx and Theory of Revolution' বইয়ে এই ঘটনাটি বিশদভাবে উল্লেখিত আছে। একসময় মার্ক্স তাঁর জামাতা সাংবাদিক পল লাফাৰ্গকে বলেছিলেন, “এই যদি তোমাদের মার্ক্সবাদ হয় তাহলে আমি মার্ক্সবাদী নই।" কারণ লাফাৰ্গ ছিলেন ফরাসী সমাজতন্ত্রী দলের নেতা ও তৎকালীন ফরাসী সমাজতন্ত্রীরা নিজেদেরকে মার্ক্সবাদী বলে আখ্য়া দিত।   কিন্তু তারা যেভাবে মার্ক্সবাদকে ব্যাখ্যা করত তা অপব্যাখ্য়ার সমান। তারা ছিলো সংস্কারবাদী (reformist)। তাই মার্ক্স তাদের প্রতি বিরক্ত ছিলেন এবং সেই বিরক্তি থেকেই ওই বিখ্য়াত উক্তি। পরবর্তীকালে ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস বহুবার উক্তিটির কথা উল্লেখ করেছেন মার্ক্সবাদের অপব্যাখ্যা খণ্ডন করার জন্য।
যেমন- 
. ১৮৮১ সালে এডুয়ার্ড বার্নস্তাইনকে একটি চিঠিতে এঙ্গেলস সংস্কারবাদীদের প্রসঙ্গে এইকথা লিখেছিলেন।
২. এরপর ১৮৯০ সালের ৫ আগস্ট কনরাড স্মিডটকে চিঠিতে এঙ্গেলস লিখেছিলেন - And the materialist conception of history also has a lot of friends nowadays to whom it serves as an excuse for not studying history. Just as Marx used to say about the French "Marxists" of the late 'seven ties: "All I know is that I am not a Marxist." ( ইদানিংকালে ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার বেশ কিছুসংখ্যক ভয়ঙ্কর বন্ধু দেখা দিয়েছে, যারা এই বস্তুবাদী ধারণাকে ব্যবহার করে ইতিহাসকে না-পড়ার অজুহাত হিসেবে । এই কারণেই সত্তরের দশকের শেষের দিকে ফরাসী সমাজতন্ত্রীদের সম্পর্কে মার্ক্স মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি যা বুঝতে পারছি তা হল, ‘আমিই তাহলে মার্ক্সবাদী নই’।”) ( সূত্র-  The Correspondence of Marx and Engels, page-415)
৩. ১৮৯০ সালের ২৭ আগস্ট এঙ্গেলস পল লাফাৰ্গকে চিঠি লেখেন। সেইসময়  জার্মান পাটিতে একদল বুদ্ধিজীবী ছিলেন তারা মার্ক্সবাদী বলে দাবী করলেও আসলে ছিলেন সংস্কারবাদী। তাদের সম্পর্কেই বলতে গিয়ে মার্ক্সের মন্তব্যটি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি লিখেছিলেন -   These gentry all dabble in Marxism, albeit of the kind you were acquainted with in France ten years ago and of which Marx said: 'All I know is that I'm not a Marxist.' ( সূত্র- Marx and Engels Collected Works, Volume 49 : Letters 1890-92, page-22)

এঙ্গলসের এই বক্তব্য থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মার্ক্স কখনই বলেন নি যে, তিনি মার্ক্সবাদী নন। যারা মার্ক্সের বিপ্লবী মতবাদকে সংস্কারবাদে পরিণত করে তাকে মার্ক্সবাদ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তাদের প্রসঙ্গেই বিরক্তি সহকারে তিনি ওই উক্তি করেন। 
আসলে মার্ক্সের আসল কথাটি ছিল -  "ce qu'il y a de certain c'est que moi, je ne suis pas Marxiste"।  যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় "what is certain to me is that [, if they are Marxists, then] I am not [a] Marxist". এবার অনেকেই আক্ষরিক অনুবাদ করতে গিয়ে উহ্য় কথাটিকে বাদ দেন। ফলে কথাটির অর্থ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আর সেই থেকেই ভ্রান্ত ধারণার জন্ম হয়।