Showing posts with label মনের কথা. Show all posts
Showing posts with label মনের কথা. Show all posts

Saturday, 1 May 2021

বঙ্গ-যুদ্ধের দায়

ছোটবেলায় বায়না করে ফুটের দোকান থেকে একখানা ছবিতে মহাভারত কিনেছিলাম। সাধারণত খুবই নিম্নমানের পাতা আর বাঁধাই, ছবিও অপটু হাতে আঁকা। দশ-বিশ টাকায় পাওয়া যেত বলে বাড়ির লোক কিনে দিতে দ্বিধা করেনি। সেই প্রথম মহাভারত পড়া, তার আগে কিছু ছোট ছোট গল্প জানতাম। ছবিগুলো খুব ভাল না হলেও প্রথম পড়া তোহ, তাই মনে দাগ কেটে গেছিল। তাই পরে রাজশেখর বসু বা কালীপ্রসন্নের মহাভারত পড়ার সময়ও কল্পনায় ওই ছবি গুলো ভেসে উঠত। বইটায় স্ত্রী পর্বে একটা ছবি ছিল, অষ্টাদশ দিনের যুদ্ধের শেষে সমস্ত শব সৎকার করা হচ্ছে, গণচিতার ধোঁয়া আকাশ গ্রাস করেছে।  কেন জানিনা ছবিটা বহুদিন মনে রয়ে গেছিল। তবে সময়ের সময়ের সাথে তা মুছেও যেতে বসেছিল।

কদিন আগে গণচিতা জ্বালানোর ছবি দেখে মহাভারতের সেই ছবির কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ।

কথায় আছে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। এক পারিবারিক বিবাদ থেকে আঠারো অক্ষৌহিণী সেনার প্রাণ গেল।

কদিন আগে রাজ্যজুড়ে আঠারো না হোক আট দফায় যুদ্ধ হয়ে গেল, কত রথী মহারথী লড়েলেন, কত বাদবিবাদ, কত হইচই। অনেকের কাছে এ যুদ্ধ ভারত যুদ্ধের মতই গুরুত্বপূর্ণ। যে যার মত করে ভাবছে, সে সঠিক পথে আছে। জয় কার হবে তা সময়ই বলবে। কিন্তু এই যুদ্ধের ফলে সংক্রমণ যে বাড়ল, কত মানুষের জীবন জীবিকা আবার বিপদের সম্মুখীন হল, তার দায় নেবে কে? না কি সবই ওই আনুসাঙ্গিক ক্ষতি, মার্কিনী পরিভাষায় যাকে বলে – collateral damage।


এ যুদ্ধ শেষেও কত গণচিতা উঠবে তার ইয়ত্তা নেই। ভারত যুদ্ধের শেষেও যুদ্ধক্ষেত্র পুরনারীদের হাহাকারে ভরে উঠেছিল – এখনও চারিদিকে হাহাকার উঠছে, অক্সিজেন, বেড, ওষুধের জন্য।

আমি নেহাতই ছাপোষা মানুষ, নির্বাক দর্শক হওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। তবে ভারত-যুদ্ধে সব মৃত্যুর দায় নিয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি কোন প্রতক্ষ্য হত্যা করেননি কিন্তু তিনিই যুদ্ধের মূল কুশলী ছিলেন, তাই নিজের নৈতিকতার দিক দিয়ে পাপের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নেন। পণ্ডিত লোকেরা বলেন এই কারণেই তিনি ভগবান। আবার কেউ কেউ বলেন ভারতভূমি কাউকেই ছাড়ে না, সবাইকে তার পাপের উপলব্ধি করিয়ে দেয়, ভগবান কৃষ্ণ থেকে যুধিষ্ঠির, কেউ ছাড় পাননি। তবে সে তোহ পুরাণের গল্প।

তবে আজ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, এখনকার এই যুদ্ধের ফলস্বরূপ এত মৃত্যুর দায় কে নেবেন? কে তুলে নেবেন পাপের বোঝা?

ভারতযুদ্ধের মূল কৌশলী সেই দায় নিয়েছিলেন, আজকের দিনে একজন কোন কৌশলী নেই, সব দলেই একাধিক লোক। তবুও সংবাদমাধ্যম কাউকে কাউকে চাণক্য বানিয়ে দেয়। তারাও কি এই বঙ্গ-যুদ্ধের দায় নেবেন?




Thursday, 4 February 2021

অহিংসা

 আজ চৌরিচৌরা ঘটনার শতবর্ষ।

না, এটা সমারোহর সঙ্গে পালন করার মতো কিছু না। এ ছিল কিছু মানুষের নির্মম মৃত্যু, হয়ত তারা অত্যাচারী শাসকের নির্দেশ পালন করছিল। কিন্তু তাই বলে তাদের জ্বলন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার কোন মানে ছিল না। বড়ই নিন্দনীয় ঘটনা। কিন্তু তাই বলে কি একটি সমগ্র উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন তার সামনে বলি দেওয়া যায় ?!



লোকজন গান্ধীজীকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। কিন্তু দেবতারও কি ভুল হয় না? এ কি গুরুপাপে লঘুদণ্ড ছিল না? বারবার এ প্রশ্ন মনে এসেছে, তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু আজ উপলব্ধি করতে পারি।
কেন বারবার গোটা বিশ্বে civil society movement গুলোতে গান্ধীকে এইভাবে স্মরণ করা হয়। কারণ ভদ্রলোক যে রাস্তাটা দেখিয়েছিলেন, তা যেকোন গণতান্ত্রিক দেশে আন্দোলনের সর্বোত্তম পন্থা। যখন গোটা পশ্চিমা বিশ্ব একে অপরকে নির্দয় ভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল, ইউরোপে গণতন্ত্র বিপন্ন, ফ্যাসিবাদের উত্থান, তখন সভ্য ভাবে আন্দোলনের এক রাস্তা দেখিয়েছিলেন তিনি।

আমার কাছে গান্ধির প্রথম পরিচয় একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। আর রাজনৈতিক নেতার কর্মপদ্ধতি তাকে সেরা বানিয়ে তোলে, বলে আমার মত। ঠিক যেমন একজন বিজ্ঞানীর শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করি তার কাজের পদ্ধতি দিয়ে। গ্যালিলিও বা নিউটনের থিওরি দিয়ে আজকালকার দিনে বিজ্ঞানের অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু তবুও তাদের কাজের কথা লোকজন স্মরণ করে তাদের কর্মপন্থার জন্য, উদ্ভাবনী ভাবনার জন্য। আর গান্ধীজী রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য যে পন্থা গুলো দেখিয়েছিলেন, তা আজও পৃথিবীর সমস্ত গণতান্ত্রিক দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে একটা অস্ত্র – সে ধর্না হোক কি অনশন কি আইনঅমান্য।

হ্যাঁ, তাঁর আন্দোলনের ইস্যু গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, রাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে ধর্মীয় ইস্যুকে (খিলাফত) মিলিয়ে দেওয়া কিংবা শাসকের বিপদের (দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ) সময় আন্দোলন না করা – কিন্তু কর্মপন্থা যে সেরা এ নিয়ে প্রশ্ন নেই। যতক্ষণ একটা আন্দোলন অহিংস থাকে, ততক্ষণ তার প্রতি জনগণের সহানুভুতি থাকে, আর তাতে আন্দোলনকারীদের অংশগ্রহণও বাড়ে। হিংসাত্মক আন্দোলনে সচরাচর যুক্ত হতে সাধারণ মানুষের মনে ভয় করে, কারণ কেই বা চায় বলুন প্রাণ হারাতে।

এই যে যেমন দেখুন, দেশজোড়া কৃষক আন্দোলন। ধরুন আপনি যদি আর্থিক উদারীকরণের পক্ষে হন, আন্দোলনের ইস্যুগুলোকে আপনার গ্রহণযোগ্য নাও মনে হতে পারে, কিন্তু দুমাস ধরে দিল্লির হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় রাস্তায় পড়ে থেকে আন্দোলন দেখে আপনার মনে সহানুভুতি জেগেছিল। তবে যেই ২৬শে জানুয়ারি আন্দোলনে হিংসার ছোঁয়া লাগল সঙ্গে সঙ্গে নানা মহল থেকে তির্যক প্রশ্নবাণ ধাওয়া করলো। অনেক আন্দোলনকারীর উৎসাহেও ভাঁটা পড়েছিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।



এইখানেই বুঝতে পারা যায় গান্ধিজির আন্দোলনের পন্থার গুরুত্ব কতটা। কেন তিনি কয়েকজন পুলিশ কর্মীর মৃত্যুতে গোটা আন্দোলন তুলে নিয়েছিলেন। কেন মার্টিন লুথার কিং থেকে নেলসন ম্যন্ডেলা গান্ধীকে পাথেও বলে মানেন। ভারতে গণতন্ত্র আসার আগেই, এরকম এক অভিনব পথ দেখিয়েছিলেন, তিনি অবশ্যই যুগের থেকে এগিয়ে ছিলেন বলতে হয়। আর তখনই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়। আজ যখন বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র আঘাত পাচ্ছে, দিকে দিকে populist নেতাদের প্রভাব বাড়ছে, উগ্র দক্ষিণপন্থার কালো মেঘ উঁকি দিচ্ছে, তখন বোধহয় গান্ধীকে আরও বেশি করে প্রয়োজন।

Friday, 25 December 2020

লাইফ @ তেলেনাপোতা

আমরা যখন ইলেভেন পড়ি, তার ঠিক দুবছর আগে আমাদের বোর্ডের সিলেবাস পরিবর্তন হয়। আমরা ছিলাম নতুন সিলেবাসে উচ্চমাধ্যমিক দেওয়া তৃতীয় ব্যাচ, আমাদের আগে আরও দুটো ছিল। আসলে তখন জমানা পাল্টে ছিল, তাই পুরানো নীতি আদর্শ থেকে সবকিছুর শুদ্ধিকরণ করে নতুনের জন্য তৈরি করে নিতে হবে বইকি। তাই সব্বার আগে শিক্ষায় সংস্কার জরুরি। 

আমি ছিলাম সায়েন্সের ছাত্র, তা বিজ্ঞানের নিয়ম তোহ আর চাইলেই বদলানো যায় না, তাই পরিবর্তনের আঁচ আমাদের বেলায় ওই বাংলা আর ইংরেজিতে এসেই সীমাবদ্ধ ছিল। আমরা বাংলা মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা, ইংরেজিতে শিখি ল্যাংগুয়েজ মানে ভাষা, আর বাংলায় শিখি সাহিত্য। আমার আবার বরাবর গল্প কবিতা পড়তে বেশ লাগে, তাই বাংলা বই খানা বেশ পছন্দ হয়েছিল। সরকার বাহাদুরের অনুপ্রাণিত পন্ডিতেরা বই খানা সাজিয়ে ছিল খাসা, তবে একটাই ব্যাপার বাংলা বইখানা পড়লে মনে হত, যে সেটা পুরানো জমানার থেকেও আরও বেশি করে পুরনো আদর্শের পন্থী। গল্প কবিতা চয়নে তার ছাপ স্পষ্ট।

তা সে যাই হোক, আমার নীতি আদর্শ নিয়ে কি কাজ, ওসব ধুয়ে নেতারা জল খেয়ে থাকেন, আমার তোহ গল্প হলেই চলবে। তোহ হয়েছে কি, এরমই এক গল্প ছিল 'তেলেনাপোতা আবিস্কার।' এ গল্পের মতো বদখত গল্প আর পড়িনি মশাই, নামটাই কি অদ্ভুত। আমরা, বন্ধুরা প্রথম প্রথম বিস্তর হাসাহাসি করেছি এ নিয়ে। লেখকের নাম প্রেমেন্দ্র মিত্র দেখে ভেবেছিলাম হয়ত 'তেল দেবেন ঘনাদা'-র স্পিন অফ বা সিক্যুয়েল গোছের কিছু হবে। পড়তে গিয়ে দেখি, ধুর ঘনাদা তোহ নয়ই, উপরন্তু গল্পের ভাষাও কেমন ধারা। লেখক ক্রমাগত পাঠক কে বলছেন - এই ধরুন আপনি এখানে গেলেন, এটা করলেন, ওটা করলেন। আরে বাবা সবই যদি আমি করি তাহলে লেখক কিংবা গল্পের চরিত্র কি করবে। 

 

আসলে এ ছিল আমার জীবনে পড়া প্রথম গল্প যা কি না মধ্যম পুরুষে লেখা। বাংলার স্যার যখন গল্পটা বুঝিয়ে দেন তখন থেকে গোটা ধারণাটাই পাল্টে যায়। আসলে সবার জীবনেই কোথাও না কোথাও একটা তেলেনাপোতা আছে, কেউ সেখানে যেতে পারে আর বাকিদের কাছে তা স্বপ্নই থেকে যায়। 

 

আমাদের চারপাশে ঘটে চলে কত কি ঘটনা, আর শুধু চারপাশই বা কেন, ইতিহাসেও তোহ কত ঘটনার ঘনঘটা। এর মধ্যে কিছু ঘটনা আমাদের ভাল লাগে, কিছু রোমাঞ্চ দেয়, আবার কিছু ঘটনা মনটাকে ভাবিয়ে দেয়, দুঃখ দেয়। তবে সময় সময় মনে হয়, আচ্ছা এমন যদি হত, আমার সাথে এর মধ্যে একটা কিছু ঘটত, তাহলে বেশ হত না! কিন্তু ওই, সকলই মায়া, তুমি দেখবে তোমার পাশে ঘটছে, তোমার কান ছুঁয়ে হয়ত বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তোমার সাথে ঘটছে না। এজন্যই বলে, কপালের নাম গোপাল।

জানিনা না কার সাথে এমন হয়, আমার সাথে বারবার এরকম হয়, 'এই যাঃ ফস্কে গেল'। কিন্তু কি আর করা যাবে। 

তবুও মনের কোণে একটা আশা থাকে একদিন হবে, কিছু একটা হবে। যাতে মনে হবে, হ্যাঁ কিছু একখানা করেছি। একখানা আত্মতৃপ্তির নেশায় মনখানা ভরে যাবে, তারপর যতই দুঃখ হোক, একটা কিছু দিয়ে ভোলানো যাবে। মনে হবে না জীবনখানা বৃথা গেল। 

না, কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না, অন্তত পক্ষে নিজের কাছে নিজেকে খুশি করলেই চলবে। এরম কি মনে হয় না?

অনেক সময় স্বপ্ন দেখতে দেখতে এমন হয়, যে বাস্তব আর স্বপ্ন মিলেমিশে যায়। ফারাক করা মুশকিল। একা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়, কি একা একা বিছানায় শুয়ে থাকার সময়, সে স্বপ্ন আমাদের কাছে আসে, এসে গল্প করে, সুখদুঃখের কথা বলে। সে জিনিসের সাথে এমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, এতবার তাকে দেখি, তাই স্বপ্ন বলে তাকে আর মনেই হয় না। মনে হয় এই তোহ সেদিন কথা হল। কেউ না থাক, আমার মনের কথা আমার স্বপ্ন শুনবে। 

কেউই জানিনা, সে স্বপ্ন সফল হবে কি না, তবে ভাবতে দোষ কি! ভাবার ওপর তোহ কেউ ট্যাক্স বসায়নি, আর সমনও জারি করেনি। হয়ত যারা খুব বাস্তববাদী, তারা এসব ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেবে, বলবে অলীক কল্পনা। তাতে কি, সে তোহ আমার কল্পনা। কার কি এসে গেল তাতে। মাঝে মাঝে ভাবনার সাগরে ডুব দিয়ে দেখো, মন্দ লাগবে না। চিন্তা নেই, ডুবে তুমি যাবে না, কারণ এই বাস্তব পৃথিবী তোমায় ডুবতে দিচ্ছে না, সে ঠিক ঘাড় ধরে টেনে আনবে। কিন্তু তবুও যতক্ষণ ডুবে থাকা যায়, মন্দ কি। তখন মনে হবে, এই বেশ ভাল আছি। 

ওই বলে না পুজোর থেকে পুজো আসছে আসছেটা বেশি ভাল, তেমনই হয়ত স্বপ্ন পূরণের থেকে স্বপ্ন নিয়ে বাঁচাটা মনে হয় বেশি আনন্দের। তাই আমার কাছে আমার তেলেনাপোতার জীবন খানা বেশ লাগে। মাঝে মধ্যে ঘুরে আসি। তোমরাও যাও, দেখবে বড্ড ভাল লাগবে। 

 


Sunday, 29 March 2020

আমার রবীন্দ্রনাথ - তৃতীয় পর্ব

তখন ক্লাস টেন, ততদিনে বেশ অনেকগুলোয় কবিতা, গল্প পড়া হয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের। তার কিছুটা পাঠ্যবইয়ের দৌলতে আর কিছু নিজের চেষ্টায়। পালাবদলের দৌলতে রবীন্দ্রসঙ্গীত তখন রাস্তার মোড়ে আর পাড়ায় পাড়ায় বাজতে শুরু করেছে। তবে কি না ওই গল্প ও কবিতার মত  তার অর্থগুলো খুব একটা স্পষ্ট হয়নি। সুর ভাল লাগত, তাই শুনতাম, মানে বুঝতাম না খুব একটা।
তবে কি না তখনও পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়ে দেখা হয়নি। সেই সময়তে একদিন ঋতুপর্ণ ঘোষের 'চোখের বালি' দেখি টিভিতে, পুরোটা নয়, ওই কিছু কিছু অংশ। মনে হয় বাড়িতে কেউ দেখছিল, সেখান থেকে ফুলুক-ফালুক কয়েক ঝলক দেখা।
সেই থেকে মাথায় ঢুকল 'চোখের বালি' পড়তে হবে। তার একটা কারণও ছিল, ততদিনে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস সবই পড়া হয়ে গেছে। ফলত রোম্যান্টিক উপন্যাসের স্বাদ পেয়ে গেছি, তো বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকের রোম্যান্টিক উপন্যাস কিরকম হয়, তা তো চেখে দেখা হয়নি। সেই তাগিদ থেকেই আরও উৎসাহ বাড়ল। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ, তুলে নিয়ে এলাম লাইব্রেরী থেকে 'চোখের বালি'। দ্বিগুণ উৎসাহে পড়া আরম্ভ হল, কিন্তু কিছুদের যেতেই রণে ভঙ্গ দিলাম। কি কারণ জানি না, ভাষা হোক কি গল্প বলার কায়দা কোনটাই পছন্দ হল না ঠিকঠাক। আর পছন্দ না হলে জোর করে অতো বড় উপন্যাস পড়ার মানে হয় না। ফলত রবীন্দ্র উপন্যাস এর প্রতি একখানা বিতৃষ্ণার ভাব জন্মাল।
এর প্রায় মাসখানেক পর, আমার বন্ধু রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা পড়াল আমায়। কবিতাটা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত একটা কবিতার বইয়ে। কবিতাটা অনেকটা এই এইরকম -

পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায়ে আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।

নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
হঠাৎ কখন সন্ধ্যেবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ,
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেনড্রনগুচ্ছ।

নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
নাই রে ঘরের লালন-ললিত যত্ন।
পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
আমরা চকিত অভাবনীয়ের
ক্কচিৎ কিরণে দীপ্ত।



কবিতাটা পড়ে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি এটা রবীন্দ্রনাথের, জিজ্ঞেস করলাম বন্ধুকে "কোন কাব্যগ্রন্থে আছে ?" 
ও বলল, " কাব্যগ্রন্থ নয়, উপন্যাস।"  
"উপন্যাস ! কি উপন্যাস ?" 
"শেষের কবিতা।" 

নামখানা মগজে ঢুকে গেল। পড়ে দেখতে হবে একবার। কবিতাটা অবাক করেছিল আরও 'রডোডেনড্রনগুচ্ছ' কথাটার জন্য। কারণ রবীন্দ্রনাথ অনেক বিদেশি ফুলের নামকরণ করেছিলেন, যেগুলো শুনতে অনেকবেশি শ্রুতি মধুর, কিন্তু রডোডেনড্রন, যা কি না কিরকম গাছ পালার ল্যাটিন নামের মতই খটমট শোনায়, সেটাকে না পালটে সরাসরি কবিতায় ব্যবহার ভারী অবাক করেছিল।
তার ওপর বন্ধু বলেছিল এই উপন্যাসটা না কি রবীন্দ্রনাথের অন্য সব উপন্যাস থেকে আলাদা। 
তবে এইবার আর সঙ্গে সঙ্গে গিয়েই উপন্যাসটা খুঁজ পড়তে বসিনি। কে জানে হয়ত আগের অভিজ্ঞতা হয়ত উৎসাহে ভাঁটা ফেলে দিয়েছিল। তো যাকগে সে কথা, সময় করে একদিন উপন্যাসটা পড়েই ফেললাম। পড়ার সময় কতকগুলো জিনিসে চোখ আটকাল, যার মধ্যে অন্যতম উপন্যাসটার ভাষা আর গল্প বলার কায়দা। পড়ে মনে হল, 'আরে! এতো এখনকার ভাষায় কথা বলছে।' ৮০-৯০ বছরে একটা ভাষায় বেশ ভালই পরিবর্তন আসে, তা পড়লেই বোঝা যায়, কিন্ত এতো তা নয়, মনে হল এ যে অসম্ভব। তরতর করে পড়তে থাকছিলাম, মাঝে মাঝে কবিতাও বেশ দারুণ। 
যখন পড়া শেষ করলাম, তখন অদ্ভুত একটা মন ভাললাগা কাজ করছিল। কি জানি কেন, মনে হতে লাগল, আরে এতো যেন আমার মনের মত উপন্যাস। 
আগেই বলেছি, শরদিন্দুর রোম্যান্টিক উপন্যাস পড়া হয়েগেছে, প্ত্র পত্রিকার দৌলতে সমকালীন লেখকদের উপন্যাস ও কিছু আন্তর্জাতিক উপন্যাসও পড়ে ফেলেছি ততদিনে। কিন্তু শেষের কবিতা পড়ে মনে হল ধুর ধুর কোথায় লাগে ওইসব রোম্যান্টিক উপন্যাস গল্প। অমিত-লাবণ্য তখন মনের গহনে ঢুকে পড়েছে।
পরে জেনে অবাক হয়েছিলাম যখন এই উপন্যাস লেখা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৬০ ছাড়িয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে মনের মধ্যে কতটা যৌবন থাকলে ওই বয়সে ওতটা প্রাণবন্ত উপন্যাস লেখা যায়, যা এক কিশোরের মনেও হিল্লোল তুলবে। 
এরপরে আমি দেশি-বিদেশি অনেক রোম্যান্টিক উপন্যাস পড়েছি, কিন্তু 'শেষের কবিতা'-র মতো একটাও উপন্যাস পায়নি। আজ পর্যন্ত আমার কাছে শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক উপন্যাস 'শেষের কবিতা'। সন্ধানে আছি এখনও আরও ভাল উপন্যাস পড়ার। খুঁজে চলেছি। যদি না পাই, তাহলে হয়ত এটাই সত্য হবে যে -  "বিধাতার রাজ্যে ভালো জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।"









Friday, 21 February 2020

পাপ ও এনার্জি

অনেকদিন ধরেই কথাখান মনের মধ্যে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, যে ভাল মানুষ, ভাল সংস্থা, ভাল দল কাকে বলে। ভালত্বের মাপকাঠি কি? আসলে ভাবনার শুরুটা ভারতের রাজনৈতিক দল গুলো ও রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গ নিয়ে। সচরাচর কোন রাজ্যে বা দেশে ক্ষমতাসীন শাসক দলের নিন্দেমন্দ অহরহ শোনা যায়। ভাল করে ভেবে দেখুন প্রতিটা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কোন না কোন গুরুতর অভিযোগ আছে, রক্তে হাত রাঙানোর ইতিহাস আছে, যেমন বিজেপির গোধরা, কংগ্রেসের শিখ দাঙ্গা, সিপিএমএর মরিচঝাঁপি ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা ব্যাপার পষ্ট সমস্ত পোলিটিক্যাল পার্টির হাতেই রক্ত আছে। এখন পার্টির সমর্থকরা হয় ব্যাপারটা জানেন না অথবা ওই পাস্ট জেনেও অন্ধ ভাবে ভালবাসে ( অনেক খানি এরকম, I don't bother about your past)। 
কিন্তু এত গেল সমর্থকদের কথা, কিন্ত সাধারণ জনগণ যখন পোলিং বুথে যান তখন ঠিক কি ভেবে ভোট দেন ? কারণ আপনি রাস্তায় ভাল করে কান পাতলে এটুকু বুঝবেন তারা এটা ভাল করে জানে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের কমবেশী অধিকাংশ নেতা চোর-চোট্টা ও বদমাইশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সাপেক্ষে যাকে তার কম খারাপ মনে হয় তাকেই হয়ত ভোটটা দেয়। আর এই কারনেই সরকার পরিবর্তন হয়, কারণ সময়ে সময়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন বদলায় সাধারণ মানুষের চোখে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার আগ্রহ জাগে এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। বড় বড় ইন্টেলেকচুয়ালরা যতই এই ভারতবাসীকে অজ্ঞ মনে করুক, তা আসলে নয়। কমবেশি সবাই ভাবে। 
আগেই বললাম ভাল খারাপের বিষয়টা সময়ে সময়ে  পরিবর্তন হয় এবং এটা আপেক্ষিকও বটে।আচ্ছা বলুন তো কোন জিনিস ঠান্ডা বা গরম বোঝান কি করে, মানে এক টুকরো বরফ এর থেকে আপনার শরীরের তাপমান গরম আবার আগুনের শিখার থেকে ঠান্ডা। অনেক সময় আমরা মিনারেল ওয়াটার কিনতে গিয়ে বলি, 'ঠান্ডা নয়, নরমালটা দেবেন'। নরমাল মানে স্বাভাবিক, এখন আমরা মোটামুটি স্বাভাবিক বলি ওই ধরুন 20-30℃ জলকে। আবার যে টেম্পারেচার এর জল আমরা সাধারণ বলি সেই টেম্পারেচার এর চা কেই আমরা বলি ঠান্ডা হয়ে গেছে। 
মানুষের পাপ পুণ্যটাও এভাবে নির্ভর করে। এখন দেখুন পৃথিবীতে পাপহীন মানুষ হয় না, খুঁজে পাবেন না, বুকে হাত দিয়ে বলুন আপনি কোনদিন কোন অন্যায় করেননি। পারবেন? মনে তো হয়না। 
আসলে পাপহীন মানুষ পরম শূন্য তাপমাত্রার মতো, যেখানে এনার্জি শূন্যের কাছেই। প্রতিটি ধাপে এনার্জি নিতে নিতে তাপমাত্রা বাড়ে। আর এই এনার্জি এমনি এমনি বাড়ে না, কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া করতে হয় সেই বস্তুকে, তবেই সেই বস্তু এনার্জি লাভ করে। এখন পাপও সেরকম, সমাজে চলতে গেলে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় পাপের পরিমাণ বাড়ে। 
এখন যখন এনার্জি যদি একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যায়, তখন তার তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে সাধারণ তাপমাত্রায় পৌঁছবে। কিন্তু তার পরও যদি সে এনার্জি নেয়, তাপমাত্রা আরও বাড়বে। আর তাকেই আমরা গরম বা উচ্চ তাপমাত্রা বলি। 
এখন জীবনে স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে গিয়ে আমরা কিছু পাপ কাজ করি। তাতেই আমরা সাধারণ মানুষের স্তরে আসি। এখন অনেক সময় দেখা যায়, আমরা সৎ লোককে বোকা বলে থাকি, বুদ্ধি করে ঠিক সময় আখের গোছাতে পারিনি বলে। আসলে সে ওই পাপ গুলো করে সাধারণ এর থেকে জাতে উঠতে পারেনি। আবার অত্যধিক পাপ করলে সে সাধারণ এর জাত থেকে বিচ্যুত হয়।
মজার ব্যাপার হলো একই পরিমাণ এনার্জি নিলে সমস্ত বস্তুর একই পরিমাণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয় না। তার ভর বা mass যদি বেশি হয়, তাহলে দেখব তাপমাত্রা বৃদ্ধি কম হচ্ছে। তেমনই সমাজে একই অন্যায় করে বড় মানুষের পাপ কম হয় কিন্তু ছোট মানুষের পাপ বেশি হয়। 
আবার ওই যে বললাম একই তাপমাত্রার জলকে সাধারণ কিন্তু চা কে ঠান্ডা বলি। তেমনই একই পাপ করে একজন শিল্পপতি যতটা ছাড় পান একজন অধ্যাপক বা অধ্যাপিকা নন। 
আগে আমরা জানতাম পরম শূন্য তাপমাত্রায় এনার্জি শূন্য, পরে গিয়ে জানলাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর মতে পরম শূন্যতেও কিছু এনার্জি থাকে। ঠিক যেমন আমরা জানতাম যুধিষ্ঠির সত্য কথা বলেন, কিন্তু তারও রথের চাকা মাটি ছুঁল।

মোদ্দা কথা এই যে পাপ একটা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু অত্যাধিক পাপ সাধারণ নয়, তা ক্ষতিকারক।
তাই মানুষ বিচার করার আগে তার একটি পাপ দেখে বিচার করা যায় না, বরফ থেকেও ধোঁয়া ওঠে, গরম জল থেকেও ওঠে, কিন্তু দুটোর তাপমাত্রা তো এক নয়। 
হয়ত বা এই ওপরের কথা গুলো নিতান্ত ভাট বকা বা আমার অর্থহীন কল্পনা। কিন্তু আপনি এতক্ষণ ধরে এই পাগলের প্রলাপ পড়লেন তার ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না।
তবুও বলব কোথাও একটা এক সমান্তরাল সম্পর্কে আছে - পাপ ও এনার্জি। 

Friday, 1 November 2019

লুকোনো থাকা প্রতিভাগুলো

কদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে আমার জোর তর্ক হচ্ছিল, প্রতিভা বলে কি কিছু হয়? যার জোরে কোন লোক সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠে। না কি পুরোটাই নিয়মনিষ্ঠ অনুশীলনের ফলে? আমার মত ছিল ট্যালেন্ট বলে কিছু আছে, যার মাধ্যমে কোন কাজে কেউ অনায়াসে নিপুণ হযে ওঠে, আর যার তা নেই, সে নিপুণ হয়ে উঠে কঠিন আয়াসে। তো সে বির্তক সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ হয়নি। তাই দুজনের মনের ভাব ও পুরোটা প্রকাশ হয়নি, তো কোন কনক্লুশনেও আসতে পারিনি।
আসলে সময়ের অভাবে এরম অনেক আপাত অদরকারী অথচ মূল্যবান বিতর্ক বা আলোচনা থেমে যায়। তেমনই এই দৌড়ে অনেকের সুপ্ত প্রতিভা চাপা পড়ে যায় বা টিমটিম করে জীবনের কোন খুব নরম কোনে, খুব যত্ন করে কেউ বাঁচিয়ে রাখে সেই প্রতিভার ছটাকে। তার বিচ্ছুরিত আলোর প্রকাশ মাঝে মধ্যে দেখি তাদের সাজানো নোটবুকে, হোয়াটস্যাপ স্ট্যাটাসে বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মঞ্চে। অনেক ক্ষেত্রে দেখি সেই প্রতিভা প্রথাগত শিল্পীদের তুলনায় অনেক ভালো। যেন মনে করলেই সে শিল্পী হতে পারত, শিল্পকে জীবনের পাথেয় করে এগিয়ে যেতে পারত, কিন্তু যায়নি। প্রশ্ন হয়, কেন যায়নি ? 
এদের মধ্যে কেউ হয়ত, সাহস করে উঠতে পারেনি।
আসলে আমাদের সমাজে ভাল লাগার থেকে ভাল থাকার জন্য বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের নিরিখে মাপা সেই ভাল থাকা, আদেও ভাল থাকা হয়ে ওঠে না। আবার অনেকের ক্ষেত্রে, তারা দুদিকেই পারঙ্গম। তাই যেটা বেশি ভাল লাগছে সেটাই করছে।
আসলে সমাজকে দোষ দেওয়াটাও বোধ হয় ঠিক না। কারন অনেক ক্ষেত্রেই,  ওই শিল্প কোন অপেশাদার শিল্পীকে একটা স্ট্রেস রিলিফের মতো কাজ দেয়। সেক্ষেত্রে শিল্প যদি তার পেশা হত, তাহলে সেটাই হতো তার কাছে স্ট্রেসফুল। তার থেকে বরং মনের এক কোনায়, সন্তর্পনে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা ভাল।
তবে সব চেয়ে অবাক হই, সেইসব লোককে দেখে, যে বন্ধুকে অনেকদিন ধরে চিনি, তার কোন সুপ্ত গুনকেই জানতাম না। হঠাৎ দেখে চমকে উঠি। 
আসলে মানুষের মধ্যে এই রকম গুণের বাহার থাকলে তবেই মনে হয় সম্পূর্ণ। তাতে হয়ত জীবনটা রঙিনও হয়।
অপেশাদার বা অ্যামেচার শিল্পের মজাই আলাদা।
তা যেন অনেক বেশি রঙিন, আর অনেক বেশি আনন্দদায়ক, সৃষ্টিকর্তা ও উপভোগকারী দুজনের কাছেই।
কাজের ফাঁকে সময় বাঁচিয়ে একটু ছবি আঁকা, গান গাইতে পারা বা লেখালিখি বা অন্য যে কোন কিছু। এতেই তো মনে হয় আনন্দ, বেঁচে থাকার আসল মানে। হোক না কিছু এমনি এমনি, সব কিছু জাগতিক প্রয়োজনের তাগিদে হবে তার কি মানে? 
হোক না আমরা সবাই সেই ভুল স্বর্গের বাদিন্দা, যেখানে নিয়মের বাইরেও কিছু হয়, প্রয়োজনের বাইরেও হয়।
এইভাবেই যেন চলুক সব কিছু।
এই তো জীবন। 

Tuesday, 3 July 2018

আমার রবীন্দ্রনাথ - দ্বিতীয় পর্ব

আমাদের প্রাইমারী স্কুলের পাঠ্য বইয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্পসল্প থেকে একটা গল্প ছিল - দাঁড় ও পাল। মূল গল্প 'বড় খবর'-এর প্রথমাংশটা।   তখন সেই সময় গল্পটা আমার বেশ মজার লেগেছিল। মানে ছোটবেলায় আমার ভাল লাগা রবীন্দ্রনাথের একমাত্র গল্প বলা যায়। তখন অবশ্য গল্পটার আভ্যন্তরিন অর্থ বুঝিনি। বাবা বলেছিলেন গল্পটা নাকি দারুণ। আমি অতশত বুঝিনি ভাল লেগেছিল ব্যাস। আমার দাঁড় ও পালের মধ্যে ঝগড়াটা বেশ মজার লেগেছিল।

রবীন্দ্রনাথের গল্প প্রথম উপলব্ধি করি হাই স্কুলে উঠে। আমাদের প্রধান পাঠ্য বইয়ের সাথে একটা করে সহায়ক পাঠ বই থাকত। তো সেই সহায়ক পাঠেই 'ছুটি' গল্পটা ছিল। আর গল্পে ফটিকের বয়স আমাদের তখনকার বয়সের মতোই। এই বয়স শৈশব ও যৌবনের মাঝামাঝি পর্যায়। ওই সময়ের অবস্থাকে এত সুন্দর করে যেন কেউ আর বলেনি। পড়লেই মনে হত আরে এতো আমারও কথা।

"তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই । শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না । স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে । তাহার মুখে আধো-আধো কথা ও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্ৰগলভতা ......... তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায় ; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মৰ্মে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবাৰ্য ক্রটিও যেন অসহ বোধ হয় ............  এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিম্বা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত হইয়া থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না ; কারণ সেটি সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে । "

মনে হয়েছিল, সত্যি তো এভাবে কেউ আমার জন্য কোনদিন বলেনি তো। কোথাও একটা মনের ভিতরে রবীন্দ্রনাথ জায়গা করে নিলেন, মনে হল এ বড় আপনার জন, এ আমার রবীন্দ্রনাথ।  আর কারও নয়। যে কথা কাউকে বলা যায়না, তিনিই যেন বলে দিয়েছেন সে কথা। আমাকে মুখ ফুটে অনুযোগ করতে হয়নি। সবচেয়ে মনে ধরেছিল এই কথাটা -  "এই বয়সে সাধারণত নারীজাতিকে কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বৰ্গলোকের দুর্লভ জীব বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয়, অতএব তাহাদের নিকট হইতে উপেক্ষা অত্যস্ত দুঃসহ বোধ হয়।"   মোক্ষম লেগেছিল এই জায়গাটা।

পরে ভেবে দেখেছি কিশোর সাহিত্য অনেকে লিখেছেন। হয়তো আরও লিখবেন, কিন্তু এভাবে একটি কিশোরের মনোভাব তুলে ধরতে। অন্যরা কিশোরদের জন্য লেখা বলতে হয়  রহস্য রোমাঞ্চ বুঝেছেন না হলে 'হও ধরমেতে বীর'-মার্কা গল্প।  কিন্তু কিশোররা কি চায় তা বুঝতে চাননি। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, তাই তো তিনি রবীন্দ্রনাথ। হয়তো আজ - রবীন্দ্রনাথকে কেন ভাল লাগে - জিজ্ঞেস করলে বলব অন্য কোন কারন, কিন্তু সেই সময় জিজ্ঞেস করলে বলতাম 'ছুটি'।
সেই সময়ের পর থেকে রবীন্দ্রনাথের সাথে এক অভেদ্য সম্পর্কে যেন জড়িয়ে পড়ি। তারপর থেকে যেখানে আর কোন ভাঙ্গন ধরেনি।





 আমার রবীন্দ্রনাথ - প্রথম পর্বের লিঙ্ক

Sunday, 1 July 2018

আমার রবীন্দ্রনাথ - প্রথম পর্ব


                       ক্ষান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির 
                      পাঁচ বোন থাকে কালনায়,
                     শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়,
                       হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।

ছোটবেলায় 'ছড়ার মজা' বলে আমাকে একটা বই কিনে দেওয়া হয়েছিল। উপরের কবিতার লাইনগুলি বইটার প্রথম কবিতার প্রথম চার লাইন। ছোট্ট বইটা ছিল এমনই সব মজার কবিতায় ভরা। বই এর লেখক শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর এভাবেই আমার সাথে প্রথম আলাপ সেই গল্পদাদুর। হ্যাঁ দাদুই বটে, ছবিটা প্রথম দেখে শুধু আমার কেন যে কোন বাচ্চাই সেটা মনে করবে। যেন কোন রূপকথা দেশের লোক। ইয়া লম্বা দাড়ি, আর পা থেকে মাথা অবধি জোব্বা পড়ে আছেন। সব কিছুর মধ্যে যেন মুখটা ছোট্ট করে দেখা যাচ্ছে, বলা ভাল উঁকি দিচ্ছে যেন। তখন আমার বয়স তিন কি চার, তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি।
এরপর আর সমস্ত বাঙালি শিশুর মতোই আমিও স্কুলে গেলুম, আর হাতে পেলুম সহজ পাঠ।
                   ছোট খোকা বলে অ আ 
                শেখেনি সে কওয়া।


ধীরে ধীরে পাঠ এগোতে থাকল। ক্লাস ২এর পর আমরা আর সহজ পাঠ পরিনি, কিন্তু সেই স্মৃতি গুলো মনে থেকে গেছে। এবার একটা মজার কথা বলি। সহজ পাঠের প্রথম দিককার কবিতা গুলো বেশ ছন্দ মিলিয়ে পড়া যেত। পড়তে ভালোই লাগত। কিন্তু শেষের দিকে "ষ্টীমার আসিছে ঘাটে, প’ড়ে আসে বেলা" বলে একটা কবিতা ছিল। কিন্তু তখন সেই সব ছন্দ বুঝতাম না। শুধু জানতাম লাইনের শেষে এসে থামতে হয়। আর এতেই হতো বিপত্তি। কবিতাটা পড়লে এই রকম শোনাত। “শূন্য হয়ে গেল তীর আকাশের কোণে / পঞ্চমীর চাঁদ ওঠে দূরে বাঁশবনে / শেয়াল উঠিল ডেকে মুদির দোকানে।” অবাক হয়ে যেতাম। কি রকম বোকা বোকা লাগত আমার। আর এদিকে দাড়ি কমা অনুযায়ী থামলে তাতে মানে হত, কিন্তু ছন্দ পেতাম না ঠিক। ভাবতাম কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে। এখন এই কথা গুলো মনে পড়লে বেশ হাসি পায়।
         

পৃথিবীতে হয়তো অনেক প্রাইমার আছে। বাংলা ভাষাতেও আছে আরো। কিন্তু সহজ পাঠ কোথাও একটা আলাদা। মনের অনেক ভিতরে।
এরপর ক্লাস এগিয়েছে, একটু একটু করে বড় হয়েছি। প্রতি ক্লাসেই অন্তত একটা করে রবীন্দ্রনাথের পদ্য ও গদ্য থাকত। তবে শুধু পাঠ্য বইয়েও নয়, তার বাইরেও রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা পড়েছিলাম। তখন আমাকে বাড়ি থেকে আরও দুটো কবিতার বই কিনে দেওয়া হয়েছিল - 'শিশু' আর 'শিশু ভোলানাথ'। তবে সব কবিতা গুলো যে পড়তাম তা নয়। যেগুলো ভাল লাগত, সেই গুলোই বারে বারে পড়তাম। তারমধ্যে শিশু বইটা থেকে 'মাস্টারবাবু' কবিতাটা বেশ প্রিয় ছিল। কবিতাটা এতবার পড়েছিলাম মুখস্ত হয়ে গেছিল।
তবে এছাড়াও কিছু কবিতা মুখস্ত করতে হয়েছিল। স্কুলে পরীক্ষার জন্য আর পাড়ায় রবীন্দ্র জয়ন্তীর জন্য। তখন রবীন্দ্র জয়ন্তী ছিল আমার কাছে বেশ একটা উত্তেজক ব্যাপার-স্যাপার। তবে একটা জিনিস কবিতা বলব, মঞ্চে উঠব এটা নিয়ে বেশ আনন্দ থাকেলেও আসল মজাটা টের পেতাম মুখের সামনে মাইকটা পাওয়ার পর। বার বার মনে হত এই যদি ভুলে যাই। তবে আমার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল, মানে এখনও আছে আর কি। আমি কবিতা বলাকালীন কবিতা থেকে কিছু শব্দ মুছে দিয়ে নিজের মতো কিছু শব্দ বসিয়ে নিতাম। এতে একটা জিনিস হত, মঞ্চে বলার সময় ঘাবড়ে যেতাম না। কিন্তু সমস্যাটা হত এর পরে। ভীষণ বকা খেতাম আরকি। কারণ রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা গুলো কম বেশি সবার জানা। ফলে ফাঁকি দেওয়ার কোন উপায় ছিল না।
শিশু ভোলানাথ বইটা থেকে একটা কবিতা আমার বেশ ভাল লাগত - খেলা ভোলা। কবিতাটা অবশ্য সহজ পাঠেও ছিল। কবিতার লাইন গুলো পড়লেই কি রকম চোখের সামনে ছবি ভেসে উঠে।
 শীতের বেলায় দুই পহরে
দূরে কাদের ছাদের ’পরে
ছোট্ট মেয়ে রোদদুরে দেয়
 বেগনি রঙের শাড়ি।
Related image
শিশু ভোলানাথের আরেকটা কবিতাটার সাথে নিজের মনের কথাটা খুব মিলে যেত। সেটা হল রবিবার কবিতা। সত্যি আমিও ওই রবিবারের জন্য সারা হপ্তা অপেক্ষা করেতাম, আর আমারও এটাই মনে হত 
  সোম মঙ্গল বুধ এরা সব
          আসে তাড়াতাড়ি,
এদের ঘরে আছে বুঝি
          মস্ত হাওয়া - গাড়ি?
রবিবার সে কেন, মা গো,
           এমন দেরি করে?

এই ভাবে আমার একদম ছোটবেলা জুড়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে শুধু কবিতাও নয়, আমার গানও ভাল লাগত। অবশ্য এ ভাল লাগা মানে সুর বা ছন্দটা ভাল লাগা, কথা বোঝার মতো বয়স হয়নি। এর মধ্যে একটা গান ছিল, আমরা সবাই রাজা। এই গানটাতে আমি ছোটবেলায় একটা দলবদ্ধ নৃত্যনাট্যে নেচেছিলাম। সেই সুরটা বড় ভাল লেগেছিল। আর একটা গানের ছন্দটা বেশ ভাল লাগে, গানটা কেউ না থাকলে মনের আনন্দে একা একা গাইতাম। অবশ্য সুর মিলত না। সেটা হল-
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ॥
হাসিকান্না হীরাপান্না দোলে ভালে,
কাঁপে ছন্দে ভালোমন্দ তালে তালে,
নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে,
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।
কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ--
সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে
তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ॥

তবে একটা জিনিস এই সময়টায় সেভাবে রবীন্দ্রনাথের গদ্যের দিকে আকর্ষিত হয়নি। কেন জানি না ওই সহজ পাঠের পর রবীন্দ্রনাথের গদ্য আর ছোটবেলায় সেভাবে পড়া হয়নি। ওই দশ-বারো বছর নাগাদ কে একটা গল্প গুচ্ছ উপহার দিয়েছিল। কে দিয়েছিল মনে নেই, তবে জন্মদিনের উপহার এটা মনে আছে। সেখান থেকে তখন কটা গল্প পড়েছিলাম। প্রথম গল্প পড়েছিলাম ক্ষুদিত পাষাণ। এক দাদা বলেছিল ভাল গল্প, কিন্তু পড়ে আমার ভাল লাগেনি তখন, আসলে ওই বয়সে ওটা পড়া ঠিক হয়নি, কিন্তু তখন অতশত বুঝতাম না। আর এটা পড়ার পর আমার একটা ধারণা হয় যে রবীন্দ্রনাথ কবিতাই ভাল লেখেন, আর উনি তো বিশ্বকবি, কবিতাই লেখা উচিত। খামোকা কেন যে গেলেন গল্প লিখতে, কে জানে বাবা।  তবে এ ধারণাও ভেঙ্গেছিল আর দু-এক বছর পরই। সে গল্প বলব পরের পর্বে। আজ এটুকুই থাক।


আমার রবীন্দ্রনাথ - দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক 

Wednesday, 20 June 2018

আমার ডোরেমন চাই




বহুদিন আগের কথা। তখন খুবই ছোট। ক্লাস টু কিম্বা থ্রিতে পড়ি। আমাদের বাড়ির পুরানো টিভির বদলে একটা নতুন টিভি কেনা হয়েছিল। তাছাড়া আগের টিভিটা এমনিতেই খারাপ হয়ে গেছিল। নতুন টিভি আসতেই আমার আর আনন্দ ধরে না। আগের টিভিটায় অনেক কম চ্যানেল আসত। এটায় অনেক বেশি। তখনও ডিশ বা সেটটপ বক্সের যুগ আসেনি। ফলত আজকের মত হাজারখানা চ্যানেল ছিল না, কিন্তু যা আসত তা অনেক। ধীরে ধীরে ডিসনি, পোগো, কার্টুন নেটওয়ার্কের সাথে পরিচয় হয়েছিল। খুলে গেছিল এক অবাক দুনিয়া।
যারা নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে জন্মেছে তারা ব্যাপারটা ভাল বুঝবে। আসলে মুক্ত অর্থনীতির হাওয়া আর প্রযুক্তি বিপ্লবের ছোঁয়া সবে লাগতে শুরু করেছে আমাদের দেশে। টেলিভিশন ছিল তখন প্রধান বিনোদন। তো সেই কল্পনার দুনিয়ায় চিরকালীন টম অ্যান্ড জেরি ছাড়াও আরও এমন অনেক কার্টুন ছিল যা আজ আর সেরকম দেখতে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে ছিল অসওয়াল্ড, নডি।
মনে আছে একদিন ডিসনি দেখতে দেখতে একটা কার্টুনের সন্ধান পাই। আগে অ্যাড দেখাতো দেখতাম, কিন্তু তার আগে কোনদিন দেখা হয়ে ওঠেনি। গল্পটা বেশ অদ্ভুত, একটা বাচ্চা ছেলে সে খালি সমস্যায় পড়ে, সে দুর্বল। আর তাকে সাহায্য করে এক ভবিষ্যতের এক রোবট। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন ডোরেমন। কেন জানিনা অল্পদিনের মধ্যেই কার্টুনটা বেশ পছন্দের হয়ে উঠেছিল। হয়তো কোথাও আমরাও নিজেদের জীবনে নবিতার মতোই। হ্যাঁ হয়তো আমরা ওর মতো অতটা বোকা নই, কিন্তু কোথাও আমরাও নিজেকে অনেকটা অসহায় মনে করি। সত্যি যদি এই রকম কেউ একটা ত্রাতা থাকত। আজ জানি এটা সম্ভব নয়, কিন্তু ভাবতে বড় ভাল লাগে। হয়তো আমাদের প্রত্যেকের জীবনের অপূর্ণ স্বাদগুলো পূরণ করতে এই রকম একটা কেউ এলে ভাল হত। সত্যিই তো কত স্বাদ অপূর্ণ থেকে যায়। অনেক সময় সেগুলো চাপা পড়ে যায় কিম্বা জীবনে চলেতে গেলে চাপা দিয়ে রাখতে হয়। হয়তো সে ইচ্ছা গুলো বড় তুচ্ছ, কিন্তু সেই মুহূর্তে ওগুলোই ছিল সোনার চেয়ে দামি। আর কোনদিন হয়তো সেগুলো পূরণ হবেনা। কত অপূর্ণ স্বাদ মনে পড়ে, সেই সুন্দর দেখতে রঙ পেন্সিলের বাক্স বা সেই মজার কমিক্সটা, দোকানে দেখেছিলাম, কিন্তু কোন কারণে কেনা আর হয়নি। আজও থেকে যায় অনেক ইচ্ছা মনের গভীর স্থানে। কোন এইরকম বন্ধু পেলে হত যে পূরণ  করতো  এইসব ইচ্ছা। আজও বড় হয়ে মনে হয়, ওই দিন গুলোতে ফিরে যাই। যদি পেতাম ডোরেমনের টাইম মেশিনটা। 
জীবনের সমস্যায় আজও পড়ি, ভবিষ্যতেও পড়ব। কিন্তু সে সমস্যা থেকে মনে মনে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচা যায়, যখন সেই ছোট বেলার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। আসলে আমরা প্রতেকেই বাঁচি সেই শৈশব স্মৃতির অন্বেষণ করে। এই শৈশব স্মৃতিটায় হয়তো ডোরেমন, যা ক্ষণিকের জন্য হলেও বাস্তবটাকে ভুলিয়ে মনটাকে ভাল রাখে, শক্তি যোগায় আবার নতুন করে কাজে ঝাঁপানোর। ডোরেমন কোনদিন হারতে শেখায়নি। শত বিপদের মধ্যেও নবিতাকে সে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষ, অমর্ত্য সেন বলেছেন ফার্স্ট বয়দের দেশ। যেখানে সব রোশনাই ফার্স্ট বয়দের নিয়ে। তারা বড় ইন্সটিটিউশনে পড়বে, সম্মান পাবে, আর শিক্ষান্তে যাদের অধিকাংশ দেশ ছাড়বে কারণ এখানে সেরকম প্রস্পেক্ট নেই। কিন্তু এদেশে পড়ে থাকবে নবিতারাই। যারা পিছিয়ে পড়েছিল কিন্তু হারেনি। তাদের নিয়ে কেউ সেলিব্রেট করেনি, তবুও তারা আছে। আর তাদের জন্য আছে ডোরেমনরা আশা ভরসা যোগাবে তাদের। 
তাই আজও ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠি এই বলে - যে আমার ডোরেমন চাই।
আর মন বলে এই তো আমি, কেন কাঁদ বন্ধু আমি তো ছেড়ে যায়নি। আমরা এক সাথে ভবিষ্যতটা দেখব। একসাথে হাসব। এই তো আমি।
সত্যি এই জন্যই আমার ডোরেমন চাই। 

Thursday, 14 June 2018

ইতিহাস ও আমি

মনে পড়ে সেই সময়ের কথা, মাধ্যমিকের রেসাল্ট বেরিয়েছে সদ্য। রেসাল্টটা বেশ ভালই হয়েছিল, অন্তত লোকে তাই বলেছিল। সারাদিন স্তুতি বাক্যশুনে মুখের মধ্যেও একটা হাসি খেলে গেছিল কোথাও। চেষ্টা করেছিলাম মুখটাকে যথা পূর্বক গম্ভীর রাখতে, কিন্তু পারিনি। যাক গে স্কুলে গেলাম তারপর আসল রেসাল্টটা আনতে। সেখানে গিয়েই তারপর স্যরেরা অনেকেই ভাল বলল, আর তারপর যে প্রশ্নটা ছুটে এল সেটা হল, সাইন্স নিচ্ছ তো? এটা একটা ব্যাধি কি না জানিনা, কিন্তু এ বঙ্গে ছেলে মেয়েরা রেসাল্ট ভাল করলে তাকে সাইন্স নিতেই হয়, নাহলে মান থাকে না। আমি অবশ্য কোনদিন মানের কথা ভাবিনি। তবুও সাইন্স নিয়েছিলাম। অবশ্য সাইন্স নেওয়ার প্রস্তুতি মাধ্যমিকের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই নিতে হয়েছিল। মানে সবাই নেয় আরকি। তবে পরীক্ষার পর এ নিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করেছিলাম। কি নেব? কি পড়ব? তা শেষ পর্যন্ত গড্ডলিকা প্রবাহেই গা ভাসিয়েছিলাম।

এরপর এসে গেছিল সেই ভর্তির দিনটা। নিজের স্কুলেই দ্বিতীয়বার আবার ভর্তি হলাম। সেদিন খুব মজাও হয়েছিল। কিন্তু ভাবনাটা তখনও যায়নি, ঠিক করলাম তো? পারব তো?

একজনই মাত্র আমাকে প্রশ্ন করেছিল শুধু, তাও সেটা অনেক পরে অবশ্য, কিন্তু করেছিল। আমার এক সহপাঠীর ভাই, নাম অভিজ্ঞান। ও আমাদের স্কুলেই পড়ত, আমার থেকে কয়েক ক্লাস নিচুতে। তো স্কুলেই দেখা হতে ও প্রশ্ন করে, সবুজ দাদা তুমি ইতিহাস নাওনি?

ইতিহাস - আমার প্রিয় সাবজেক্ট কি না জানিনা, কিন্তু বেশ ভালোই লাগত পড়তে। মাধ্যমিকে ইতিহাসে ৯৫ পেয়েছিলাম, এখনও মনে আছে। এখনকার মত এত এমসিকিউ প্রশ্ন থাকত না তখন, ফলে নম্বরটা তোলা সহজ ছিল না। বড্ড ভাল লাগত পড়তে। অনেকে ইতিহাস সম্বন্ধে অনেক কথা বলে, যে বাজে সাবজেক্ট। কোন লজিক নেই, শুধু সাল তারিখের সালতামামি। কিন্তু আমার বড় ভাল লাগত, কি সুন্দর গল্পের মত একটা জিনিস। তবে সত্যি কথা বলতে কি, লজিক সব জায়গায় খোঁজা যেত না, আর খুঁজতামও না। শুধু জীবন আর চারপাশের সাথে মিলিয়ে দেখতাম মিলছে কি না। মিললে বুঝতাম ইতিহাস ঠিক। না মিললেই প্রশ্ন তুলতাম। আসলে ইতিহাসের গল্প গুলো পড়তে পড়তে কোথাও একটা হারিয়ে যেতাম, মন যেন টাইম মেশিন হয়ে যেত। মনে হত এই তো আনন্দ, এটাই জগৎ।

আমার এক মাসতুতো দিদির একটা উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ইতিহাস বই ছিল, বইটা নিয়ে এসছিলাম পড়ব বলে। পড়েও ছিলাম পুরোটা।

আমার ইতিহাস মানে কিন্তু শুধু প্রাচীন কালের রাজারাজড়া নয়, আধুনিক ইতিহাসও ভাল লাগত। যাতে রোমান্টিসিসম কম, আর ক্রুরতা বেশি। কিন্তু কি জানি, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন গুলো কি রকম থ্রিলিং লাগত। লোকে আজকাল পলিটিকাল থ্রিলার পড়ে, কিন্তু আমার কাছে ওগুলোই থ্রিলার ছিল। তবে একটা ব্যাপার, আমি ইতিহাস কে কোন দিন একদিক দিয়ে দেখিনি, মানে ওই পরীক্ষার আসা প্রশ্নের মতো, যেমন বলা হত আকবর কেন মহান, গুপ্তযুগকে কেন স্বর্ণযুগ বলা হয়, এই রকম আরকি। আমার কাছে মহানত্বের থেকে বড় ছিল সত্যিটা। মানে যেটা বলা হয় সেটা সত্যি কি না। এর জন্য অনেক বইও পড়তাম, সব বুঝতাম না অথচ পড়তাম। গল্পের মত পড়তে ভালই লাগত। আমার কাছে ওগুলো গল্পের বইয়ের মত ছিল। আসলে আমার মনে হয় আমার শুধু একার নয়, ওই সময় আমাদের স্কুলের দীর্ঘ সময় ধরে পরপর কয়েকটি ব্যাচের কিছু সংখ্যক ছেলেদের মনে ইতিহাস বাসা বেঁধেছিল। তার একটা কারন ছিল, আমাদের স্কুলের একজন ইতিহাস শিক্ষক, নন্দন কুমার বসু। তিনি অবশ্য ইতিহাস নিয়ে পড়তে চাননি না কি কোনদিন। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে তাকে ইতিহাস নিতে হয়, আর সেই লোকটিই ইতিহাস-প্রীতি ধরিয়েছিলেন বছরের পর বছর হাজার ছাত্রের মনে। তবে আমার ইতিহাস-প্রেম শুধু ওই কারণেই ধরেছে এটা বললে অত্যুক্তি হবে। আসলে আমার মধ্যে জানার একটা উদগ্র বাসনা ছিল, মানে আজও আছে। যা কিছু অজানা স-অ-অ-ব জানবো। অনেকটা অভিযাত্রীর মতো, বইয়ের থেকে তার বাইরের জগতে আকর্ষণ বেশি ছিল, আছে থাকেবে। কোন একটা বিষয় নিয়ে থেমে থাকতে ভাল লাগে না। কিন্তু সমস্যা হল আমি তো আর অসীমপ্রতিভা ধর নই, তাই সব কিছু পড়া সম্ভব হল না। একসাথে তাল দিতে পারলাম না। কিন্তু ইচ্ছা, সেটা যাবে কোথায়। মনের মধ্যে বারবার ধাক্কা দিয়েছে। যতবার ইলেভেন-টুয়েলভে ক্যালকুলাস নিয়ে সমস্যায় পড়েছি, অঙ্ক কিছুতেই মাথায় ঢোকেনি, বারবার মনে হয়েছে ছুটে যায় ইতিহাসের কাছে। আজকাল তো আর্টসে নম্বর পাওয়া সোজা হয়ে গেছে, গেলেই ভাল হত। এই মনে হয়েছে বারবার। কিন্তু যেতে গিয়েও পারিনি। প্রথমত নিয়মের বেড়াজালে, আর তার থেকেও বড় হল জীববিদ্যার মায়া কাটিয়ে যাওয়া। আসলে ইতিহাসের মতো এও আমার আরেক ভাললাগা। আর একেও লোকে কম দুর্নাম দেয় না। এটাও মুখস্ত করার বিষয় বলে কি না লোকে তাই। তা লোকের কথায় কান দেই নি, কিন্তু তা বলে ইতিহাসের অমোঘ আকর্ষণ এড়াতেও পারিনি। তবে এই দ্বন্দের মাঝে একটা কাজ হয়েছে, এর মাধ্যেমে আমি বুঝে গেছিলাম আমি কি চাই। আসলে আমার স্বপ্নটা একজন পলিম্যাথ হওয়ার। হ্যাঁ, পলিম্যাথ - অনেক কিছু জানে যে। ভেবে দেখলাম সত্যই তো তাই, বিজ্ঞানের পাশাপাশি পুরাণেও আগ্রহ আমার। সেই লক্ষেই এগিয়ে যেতে চেষ্টা করি, আরও একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিলাম, যে বিজ্ঞান পড়লে ইতিহাস নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে চর্চা করাই যায়। কিন্তু উল্টোটা হয় না, কেন জানি না এ এক অদ্ভুত নিয়ম। দেখবেন অনেক কবি সাহিত্যিক বিজ্ঞানের লোক। কবি নিকোনা পাররা ছিলেন অঙ্কের অধ্যাপক, আলেকজান্ডার সলঝেনিতসিনও ছিলেন অঙ্কের লোক। তবে সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম এটা জেনে। যে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ন আহমেদ রসায়ন বিদ্যার লোক ছিলেন। মনে মনে ভাবলাম, পলিমার নিয়ে পিএইচডি থিসিস লেখার পরও যদি কেউ অমন শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে, তো সবই সম্ভব। তারপর আস্তে আস্তে যখন আরও জানতে শিখলাম, অনেক লোকের সাথে পরিচয় হল তখন দেখলাম, যে অনেকেই বিজ্ঞানের লোক, কেউ আইটি ইঞ্জিনিয়ার, কিম্বা কেউ বিজ্ঞানী। তবুও এরা আপন খেয়ালে নিজের সৃষ্টিতে মগ্ন। আসলে বুঝলাম গোটাটাই এক, সৃষ্টি আর স্রষ্টার লীলা খেলা মাত্র। আমারা নিজের শুধু দাগিয়ে দিয়েছি, এটা ইতিহাস, এটা বিজ্ঞান, এই বলে। আবার চাইলাম ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখলাম, দেখলাম সত্যি তো এভাবে কেন দেখি না জীবনটাকে। সবটায় তো যুক্তিবাদী মনের খেলা, সে ইতিহাস পড়ি আর বিজ্ঞান। যুক্তি দিয়ে বিচার করাটায় আসল। ঐতিহাসিকরা তো আসলে গোয়েন্দা, সূত্র ধরে ধরে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করে চলেছেন। আর বিজ্ঞানীরা এটাই করেন, পরীক্ষার ফল দেখে বোঝার চেষ্টা সত্যিটাকে। আসলে তো আমরা সবাই আবিষ্কারক, খুজে চলেছি অরূপ রতন জীবনের খনি থেকে, যে যার নিজের মতো করে। আস্তে আস্তে নিজেকে জানলাম। পুরো জানা কখনও যায় না, তাই অনুসন্ধান চলছে। ইতিহাস তো সেটাই যা অতীতচর্চার মাধ্যমে নিজেকে জানা। নিজের শিকড়কে জানা। তাই বারবার মন চলে  যার ইতিহাসের কোলে, মাথা রেখে ঘুমোতে ইচ্ছা করে, আর মনে হয় আবার সেই টাইম মেশিন চড়ে বেরিয়ে পড়ি মানস ভ্রমণে।

বহুদিন হল ব্যস্ত জীবনের ফাকে আর ইতিহাস পড়া হয় না, সেই যে পাঠ বন্ধ করেছিলাম আর খোলা হয় নি। খুলব একদিন, খুলতে হবেই, এই আশা নিয়েই থাকি।

একদিন সত্যি ফিরে যাব ইতিহাসের কাছে।