Sunday, 29 March 2020

আমার রবীন্দ্রনাথ - তৃতীয় পর্ব

তখন ক্লাস টেন, ততদিনে বেশ অনেকগুলোয় কবিতা, গল্প পড়া হয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের। তার কিছুটা পাঠ্যবইয়ের দৌলতে আর কিছু নিজের চেষ্টায়। পালাবদলের দৌলতে রবীন্দ্রসঙ্গীত তখন রাস্তার মোড়ে আর পাড়ায় পাড়ায় বাজতে শুরু করেছে। তবে কি না ওই গল্প ও কবিতার মত  তার অর্থগুলো খুব একটা স্পষ্ট হয়নি। সুর ভাল লাগত, তাই শুনতাম, মানে বুঝতাম না খুব একটা।
তবে কি না তখনও পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস পড়ে দেখা হয়নি। সেই সময়তে একদিন ঋতুপর্ণ ঘোষের 'চোখের বালি' দেখি টিভিতে, পুরোটা নয়, ওই কিছু কিছু অংশ। মনে হয় বাড়িতে কেউ দেখছিল, সেখান থেকে ফুলুক-ফালুক কয়েক ঝলক দেখা।
সেই থেকে মাথায় ঢুকল 'চোখের বালি' পড়তে হবে। তার একটা কারণও ছিল, ততদিনে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাস সবই পড়া হয়ে গেছে। ফলত রোম্যান্টিক উপন্যাসের স্বাদ পেয়ে গেছি, তো বাংলার শ্রেষ্ঠ লেখকের রোম্যান্টিক উপন্যাস কিরকম হয়, তা তো চেখে দেখা হয়নি। সেই তাগিদ থেকেই আরও উৎসাহ বাড়ল। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ, তুলে নিয়ে এলাম লাইব্রেরী থেকে 'চোখের বালি'। দ্বিগুণ উৎসাহে পড়া আরম্ভ হল, কিন্তু কিছুদের যেতেই রণে ভঙ্গ দিলাম। কি কারণ জানি না, ভাষা হোক কি গল্প বলার কায়দা কোনটাই পছন্দ হল না ঠিকঠাক। আর পছন্দ না হলে জোর করে অতো বড় উপন্যাস পড়ার মানে হয় না। ফলত রবীন্দ্র উপন্যাস এর প্রতি একখানা বিতৃষ্ণার ভাব জন্মাল।
এর প্রায় মাসখানেক পর, আমার বন্ধু রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতা পড়াল আমায়। কবিতাটা ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত একটা কবিতার বইয়ে। কবিতাটা অনেকটা এই এইরকম -

পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
পরানে ছড়ায়ে আবীর গুলাল,
ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত।

নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
হঠাৎ কখন সন্ধ্যেবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ,
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেনড্রনগুচ্ছ।

নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
নাই রে ঘরের লালন-ললিত যত্ন।
পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
আমরা চকিত অভাবনীয়ের
ক্কচিৎ কিরণে দীপ্ত।



কবিতাটা পড়ে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি এটা রবীন্দ্রনাথের, জিজ্ঞেস করলাম বন্ধুকে "কোন কাব্যগ্রন্থে আছে ?" 
ও বলল, " কাব্যগ্রন্থ নয়, উপন্যাস।"  
"উপন্যাস ! কি উপন্যাস ?" 
"শেষের কবিতা।" 

নামখানা মগজে ঢুকে গেল। পড়ে দেখতে হবে একবার। কবিতাটা অবাক করেছিল আরও 'রডোডেনড্রনগুচ্ছ' কথাটার জন্য। কারণ রবীন্দ্রনাথ অনেক বিদেশি ফুলের নামকরণ করেছিলেন, যেগুলো শুনতে অনেকবেশি শ্রুতি মধুর, কিন্তু রডোডেনড্রন, যা কি না কিরকম গাছ পালার ল্যাটিন নামের মতই খটমট শোনায়, সেটাকে না পালটে সরাসরি কবিতায় ব্যবহার ভারী অবাক করেছিল।
তার ওপর বন্ধু বলেছিল এই উপন্যাসটা না কি রবীন্দ্রনাথের অন্য সব উপন্যাস থেকে আলাদা। 
তবে এইবার আর সঙ্গে সঙ্গে গিয়েই উপন্যাসটা খুঁজ পড়তে বসিনি। কে জানে হয়ত আগের অভিজ্ঞতা হয়ত উৎসাহে ভাঁটা ফেলে দিয়েছিল। তো যাকগে সে কথা, সময় করে একদিন উপন্যাসটা পড়েই ফেললাম। পড়ার সময় কতকগুলো জিনিসে চোখ আটকাল, যার মধ্যে অন্যতম উপন্যাসটার ভাষা আর গল্প বলার কায়দা। পড়ে মনে হল, 'আরে! এতো এখনকার ভাষায় কথা বলছে।' ৮০-৯০ বছরে একটা ভাষায় বেশ ভালই পরিবর্তন আসে, তা পড়লেই বোঝা যায়, কিন্ত এতো তা নয়, মনে হল এ যে অসম্ভব। তরতর করে পড়তে থাকছিলাম, মাঝে মাঝে কবিতাও বেশ দারুণ। 
যখন পড়া শেষ করলাম, তখন অদ্ভুত একটা মন ভাললাগা কাজ করছিল। কি জানি কেন, মনে হতে লাগল, আরে এতো যেন আমার মনের মত উপন্যাস। 
আগেই বলেছি, শরদিন্দুর রোম্যান্টিক উপন্যাস পড়া হয়েগেছে, প্ত্র পত্রিকার দৌলতে সমকালীন লেখকদের উপন্যাস ও কিছু আন্তর্জাতিক উপন্যাসও পড়ে ফেলেছি ততদিনে। কিন্তু শেষের কবিতা পড়ে মনে হল ধুর ধুর কোথায় লাগে ওইসব রোম্যান্টিক উপন্যাস গল্প। অমিত-লাবণ্য তখন মনের গহনে ঢুকে পড়েছে।
পরে জেনে অবাক হয়েছিলাম যখন এই উপন্যাস লেখা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৬০ ছাড়িয়ে গেছে। ভাবতে অবাক লাগে মনের মধ্যে কতটা যৌবন থাকলে ওই বয়সে ওতটা প্রাণবন্ত উপন্যাস লেখা যায়, যা এক কিশোরের মনেও হিল্লোল তুলবে। 
এরপরে আমি দেশি-বিদেশি অনেক রোম্যান্টিক উপন্যাস পড়েছি, কিন্তু 'শেষের কবিতা'-র মতো একটাও উপন্যাস পায়নি। আজ পর্যন্ত আমার কাছে শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক উপন্যাস 'শেষের কবিতা'। সন্ধানে আছি এখনও আরও ভাল উপন্যাস পড়ার। খুঁজে চলেছি। যদি না পাই, তাহলে হয়ত এটাই সত্য হবে যে -  "বিধাতার রাজ্যে ভালো জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।"









Friday, 21 February 2020

পাপ ও এনার্জি

অনেকদিন ধরেই কথাখান মনের মধ্যে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, যে ভাল মানুষ, ভাল সংস্থা, ভাল দল কাকে বলে। ভালত্বের মাপকাঠি কি? আসলে ভাবনার শুরুটা ভারতের রাজনৈতিক দল গুলো ও রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গ নিয়ে। সচরাচর কোন রাজ্যে বা দেশে ক্ষমতাসীন শাসক দলের নিন্দেমন্দ অহরহ শোনা যায়। ভাল করে ভেবে দেখুন প্রতিটা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে কোন না কোন গুরুতর অভিযোগ আছে, রক্তে হাত রাঙানোর ইতিহাস আছে, যেমন বিজেপির গোধরা, কংগ্রেসের শিখ দাঙ্গা, সিপিএমএর মরিচঝাঁপি ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা ব্যাপার পষ্ট সমস্ত পোলিটিক্যাল পার্টির হাতেই রক্ত আছে। এখন পার্টির সমর্থকরা হয় ব্যাপারটা জানেন না অথবা ওই পাস্ট জেনেও অন্ধ ভাবে ভালবাসে ( অনেক খানি এরকম, I don't bother about your past)। 
কিন্তু এত গেল সমর্থকদের কথা, কিন্ত সাধারণ জনগণ যখন পোলিং বুথে যান তখন ঠিক কি ভেবে ভোট দেন ? কারণ আপনি রাস্তায় ভাল করে কান পাতলে এটুকু বুঝবেন তারা এটা ভাল করে জানে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের কমবেশী অধিকাংশ নেতা চোর-চোট্টা ও বদমাইশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সাপেক্ষে যাকে তার কম খারাপ মনে হয় তাকেই হয়ত ভোটটা দেয়। আর এই কারনেই সরকার পরিবর্তন হয়, কারণ সময়ে সময়ে প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন বদলায় সাধারণ মানুষের চোখে। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার আগ্রহ জাগে এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। বড় বড় ইন্টেলেকচুয়ালরা যতই এই ভারতবাসীকে অজ্ঞ মনে করুক, তা আসলে নয়। কমবেশি সবাই ভাবে। 
আগেই বললাম ভাল খারাপের বিষয়টা সময়ে সময়ে  পরিবর্তন হয় এবং এটা আপেক্ষিকও বটে।আচ্ছা বলুন তো কোন জিনিস ঠান্ডা বা গরম বোঝান কি করে, মানে এক টুকরো বরফ এর থেকে আপনার শরীরের তাপমান গরম আবার আগুনের শিখার থেকে ঠান্ডা। অনেক সময় আমরা মিনারেল ওয়াটার কিনতে গিয়ে বলি, 'ঠান্ডা নয়, নরমালটা দেবেন'। নরমাল মানে স্বাভাবিক, এখন আমরা মোটামুটি স্বাভাবিক বলি ওই ধরুন 20-30℃ জলকে। আবার যে টেম্পারেচার এর জল আমরা সাধারণ বলি সেই টেম্পারেচার এর চা কেই আমরা বলি ঠান্ডা হয়ে গেছে। 
মানুষের পাপ পুণ্যটাও এভাবে নির্ভর করে। এখন দেখুন পৃথিবীতে পাপহীন মানুষ হয় না, খুঁজে পাবেন না, বুকে হাত দিয়ে বলুন আপনি কোনদিন কোন অন্যায় করেননি। পারবেন? মনে তো হয়না। 
আসলে পাপহীন মানুষ পরম শূন্য তাপমাত্রার মতো, যেখানে এনার্জি শূন্যের কাছেই। প্রতিটি ধাপে এনার্জি নিতে নিতে তাপমাত্রা বাড়ে। আর এই এনার্জি এমনি এমনি বাড়ে না, কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া করতে হয় সেই বস্তুকে, তবেই সেই বস্তু এনার্জি লাভ করে। এখন পাপও সেরকম, সমাজে চলতে গেলে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় পাপের পরিমাণ বাড়ে। 
এখন যখন এনার্জি যদি একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যায়, তখন তার তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে সাধারণ তাপমাত্রায় পৌঁছবে। কিন্তু তার পরও যদি সে এনার্জি নেয়, তাপমাত্রা আরও বাড়বে। আর তাকেই আমরা গরম বা উচ্চ তাপমাত্রা বলি। 
এখন জীবনে স্বাভাবিক কাজ কর্ম করতে গিয়ে আমরা কিছু পাপ কাজ করি। তাতেই আমরা সাধারণ মানুষের স্তরে আসি। এখন অনেক সময় দেখা যায়, আমরা সৎ লোককে বোকা বলে থাকি, বুদ্ধি করে ঠিক সময় আখের গোছাতে পারিনি বলে। আসলে সে ওই পাপ গুলো করে সাধারণ এর থেকে জাতে উঠতে পারেনি। আবার অত্যধিক পাপ করলে সে সাধারণ এর জাত থেকে বিচ্যুত হয়।
মজার ব্যাপার হলো একই পরিমাণ এনার্জি নিলে সমস্ত বস্তুর একই পরিমাণ তাপমাত্রা বৃদ্ধি হয় না। তার ভর বা mass যদি বেশি হয়, তাহলে দেখব তাপমাত্রা বৃদ্ধি কম হচ্ছে। তেমনই সমাজে একই অন্যায় করে বড় মানুষের পাপ কম হয় কিন্তু ছোট মানুষের পাপ বেশি হয়। 
আবার ওই যে বললাম একই তাপমাত্রার জলকে সাধারণ কিন্তু চা কে ঠান্ডা বলি। তেমনই একই পাপ করে একজন শিল্পপতি যতটা ছাড় পান একজন অধ্যাপক বা অধ্যাপিকা নন। 
আগে আমরা জানতাম পরম শূন্য তাপমাত্রায় এনার্জি শূন্য, পরে গিয়ে জানলাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর মতে পরম শূন্যতেও কিছু এনার্জি থাকে। ঠিক যেমন আমরা জানতাম যুধিষ্ঠির সত্য কথা বলেন, কিন্তু তারও রথের চাকা মাটি ছুঁল।

মোদ্দা কথা এই যে পাপ একটা সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু অত্যাধিক পাপ সাধারণ নয়, তা ক্ষতিকারক।
তাই মানুষ বিচার করার আগে তার একটি পাপ দেখে বিচার করা যায় না, বরফ থেকেও ধোঁয়া ওঠে, গরম জল থেকেও ওঠে, কিন্তু দুটোর তাপমাত্রা তো এক নয়। 
হয়ত বা এই ওপরের কথা গুলো নিতান্ত ভাট বকা বা আমার অর্থহীন কল্পনা। কিন্তু আপনি এতক্ষণ ধরে এই পাগলের প্রলাপ পড়লেন তার ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না।
তবুও বলব কোথাও একটা এক সমান্তরাল সম্পর্কে আছে - পাপ ও এনার্জি। 

Friday, 1 November 2019

লুকোনো থাকা প্রতিভাগুলো

কদিন আগে আমার এক বন্ধুর সাথে আমার জোর তর্ক হচ্ছিল, প্রতিভা বলে কি কিছু হয়? যার জোরে কোন লোক সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠে। না কি পুরোটাই নিয়মনিষ্ঠ অনুশীলনের ফলে? আমার মত ছিল ট্যালেন্ট বলে কিছু আছে, যার মাধ্যমে কোন কাজে কেউ অনায়াসে নিপুণ হযে ওঠে, আর যার তা নেই, সে নিপুণ হয়ে উঠে কঠিন আয়াসে। তো সে বির্তক সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ হয়নি। তাই দুজনের মনের ভাব ও পুরোটা প্রকাশ হয়নি, তো কোন কনক্লুশনেও আসতে পারিনি।
আসলে সময়ের অভাবে এরম অনেক আপাত অদরকারী অথচ মূল্যবান বিতর্ক বা আলোচনা থেমে যায়। তেমনই এই দৌড়ে অনেকের সুপ্ত প্রতিভা চাপা পড়ে যায় বা টিমটিম করে জীবনের কোন খুব নরম কোনে, খুব যত্ন করে কেউ বাঁচিয়ে রাখে সেই প্রতিভার ছটাকে। তার বিচ্ছুরিত আলোর প্রকাশ মাঝে মধ্যে দেখি তাদের সাজানো নোটবুকে, হোয়াটস্যাপ স্ট্যাটাসে বা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মঞ্চে। অনেক ক্ষেত্রে দেখি সেই প্রতিভা প্রথাগত শিল্পীদের তুলনায় অনেক ভালো। যেন মনে করলেই সে শিল্পী হতে পারত, শিল্পকে জীবনের পাথেয় করে এগিয়ে যেতে পারত, কিন্তু যায়নি। প্রশ্ন হয়, কেন যায়নি ? 
এদের মধ্যে কেউ হয়ত, সাহস করে উঠতে পারেনি।
আসলে আমাদের সমাজে ভাল লাগার থেকে ভাল থাকার জন্য বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের নিরিখে মাপা সেই ভাল থাকা, আদেও ভাল থাকা হয়ে ওঠে না। আবার অনেকের ক্ষেত্রে, তারা দুদিকেই পারঙ্গম। তাই যেটা বেশি ভাল লাগছে সেটাই করছে।
আসলে সমাজকে দোষ দেওয়াটাও বোধ হয় ঠিক না। কারন অনেক ক্ষেত্রেই,  ওই শিল্প কোন অপেশাদার শিল্পীকে একটা স্ট্রেস রিলিফের মতো কাজ দেয়। সেক্ষেত্রে শিল্প যদি তার পেশা হত, তাহলে সেটাই হতো তার কাছে স্ট্রেসফুল। তার থেকে বরং মনের এক কোনায়, সন্তর্পনে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা ভাল।
তবে সব চেয়ে অবাক হই, সেইসব লোককে দেখে, যে বন্ধুকে অনেকদিন ধরে চিনি, তার কোন সুপ্ত গুনকেই জানতাম না। হঠাৎ দেখে চমকে উঠি। 
আসলে মানুষের মধ্যে এই রকম গুণের বাহার থাকলে তবেই মনে হয় সম্পূর্ণ। তাতে হয়ত জীবনটা রঙিনও হয়।
অপেশাদার বা অ্যামেচার শিল্পের মজাই আলাদা।
তা যেন অনেক বেশি রঙিন, আর অনেক বেশি আনন্দদায়ক, সৃষ্টিকর্তা ও উপভোগকারী দুজনের কাছেই।
কাজের ফাঁকে সময় বাঁচিয়ে একটু ছবি আঁকা, গান গাইতে পারা বা লেখালিখি বা অন্য যে কোন কিছু। এতেই তো মনে হয় আনন্দ, বেঁচে থাকার আসল মানে। হোক না কিছু এমনি এমনি, সব কিছু জাগতিক প্রয়োজনের তাগিদে হবে তার কি মানে? 
হোক না আমরা সবাই সেই ভুল স্বর্গের বাদিন্দা, যেখানে নিয়মের বাইরেও কিছু হয়, প্রয়োজনের বাইরেও হয়।
এইভাবেই যেন চলুক সব কিছু।
এই তো জীবন। 

Thursday, 19 July 2018

পেঁয়াজ কাটলে চোখ দিয়ে জল পড়ে কেন?

সেদিন ছিল রবিবার, তাতাইদের বাড়ীতে মাংস রান্না হচ্ছে। তাতাইএর ওপর ভার পড়েছিল পেঁয়াজ কাটার। তো পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তাতাই পুরো নাজেহাল। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে সে কি অবস্থা। হঠাৎ তাতাইএর মাথায় প্রশ্ন এলো আচ্ছা পেঁয়াজ কাটলে চোখ দিয়ে জল পড়ে কেন। অন্য কোন সবজি বা ফল কাটলে এইরকম হয় না কেন। পেঁয়াজে কি এমন আছে যার ঝাঁজে কান্না পেয়ে যায়। তা দাদাকে প্রশ্ন করতে দাদা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আজ দুপুরে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে তোকে পেঁয়াজ কাটলে চোখে জল আসে কেন সেটা বলব।’ 

তো সেই কথা মতো দুপুর বেলা তাতাইকে দাদা পেঁয়াজের কাহিনি বলতে আরম্ভ করল। তবে তার আগে তাতাইকে দাদা প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা বলত পেঁয়াজের বিজ্ঞানসম্মত নাম কি?’
তাতাই এটা জানত, সে স্কুলের বইতে পড়েছে, চটপট উত্তর দিল, ‘অলিয়াম সেপা ( Allium cepa )।’
দাদা বলল, ‘তবে শোন, পেঁয়াজের কোশগুলোর মধ্যে অ্যালিনেজ (Allinase) উৎসেচক ও আইসোঅ্যালিন (Isoallin) নামক সালফক্সাইড গোত্রের এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এবার পেঁয়াজ কাটার সময় পেঁয়াজের কোশ গুলোও ছুরির কোপে কেটে যায়, তখন ওই উৎসেচক ও রাসায়নিক পদার্থ বাতাসের সংস্পর্শে বিক্রিয়া করে 1-প্রোপেনাইল সালফোনিক অ্যাসিড (1-propenyl sulfenic acid) তৈরী করে।
এরপর কোশের মধ্যে থাকা ল্যাক্রিমেটরি ফ্যাক্টর সিন্থেজ (Lachrymatory Factor Synthase) ওই 1-প্রোপেনাইল সালফোনিক অ্যাসিড থেকে সাইন-প্রোপানেথিয়াল-এস-অক্সাইড (syn-propanthial-S-oxaide) তৈরী করে। যার সংকেত C3H6OS।
এবার এই  সাইন-প্রোপানেথিয়াল-এস-অক্সাইড প্রচন্ড উদ্বায়ী, তৈরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসে পরিণত হয়। এবার এই গ্যাস চোখে পৌঁছলে চোখ জ্বালা শুরু করে। সেই জ্বালার ফলে চোখের মধ্যে থাকা স্নায়ু উদ্দীপিত হয় আর মস্তিকে সংবেদনা প্রেরণ করে। তখন মস্তিস্ক সেই জ্বালা কমাতে চোখের মধ্যে থাকা ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিকে জল বের করতে নির্দেশ দেয়। তখনই চোখে জল আসে।’

পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বিক্রিয়া


তাতাই বলল, ‘ আচ্ছা বুঝলাম, তবে রান্না করা পিঁয়াজে এই ঝাঁজ থাকে না কেন।’
দাদা জবাব দিল, ‘রান্না করলে ওই উৎসেচকটি নষ্ট হয়ে যায়, ফলে আর সাইন-প্রোপানেথিয়াল-এস-অক্সাইড (syn-propanthial-S-oxaide) তৈরী হয় না। ফলে রান্না করলে সেই ঝাঁজ থাকে না। আবার একি ভাবে পেঁয়াজ কুচি কুচি করবার আগে যদি দু টুকরো করে জলে ভিজিয়ে রাখা যায়, তখন ঐ উৎসেচক অনেকটা জলে দ্রবীভূত হয়ে যায়। তখন পেঁয়াজ কোচালে আর ঝাঁজ লাগে না।’
তাতাই বলল, ‘আচ্ছা দাদা তবে রসুনে কান ঝাঁজ হয় না? ওটাও তো অনেকটা পেঁয়াজের মতো।’
দাদা বলল, ‘এটা বেশ ভাল প্রশ্ন করেছিস। আসলে রসুনের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই রকম বিক্রিয়া ঘটে, কিন্তু রসুনে আইসোঅ্যালিনের পরিবর্তে থাকে অ্যালিন (Allin)।  এবার অ্যালিন উৎসেচক অ্যালিনেজের সাথে বিক্রিয়া করে 2-প্রোপেনাইল সালফোনিক অ্যাসিড (2-propenyl sulfenic acid)  তৈরী করে। যেখানে পেঁয়াজে তৈরী হয়েছিল 1-প্রোপেনাইল সালফোনিক অ্যাসিড (1-propenyl sulfenic acid)। এবার এই 2-প্রোপেনাইল সালফোনিক অ্যাসিড স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিক্রিয়া করে অ্যালিসিন (Allicin) নামক এক থায়সালফোনেট যৌগে রূপান্তরিত হয়। এই অ্যালিসিন কোন জ্বালা সৃষ্টি করে না। তাই রসুন কাটলে কোন ঝাঁজ বের হয় না।’

রসুনের ক্ষেত্রে বিক্রিয়া
  

তাতাই বলল, ‘আচ্ছা আজকাল তো অনেক হাইব্রিড ফল ও সবজি বেরোচ্ছে, তা এমন কোন পেঁয়াজ বানানো সম্ভব নয় যেটায় ঝাঁজ বের হয় না।’
দাদা বলল, ‘ হ্যাঁ, সেরকম কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানী একবার এই রকমই এক হাইব্রিড পেঁয়াজ বানিয়েছিলেন, যা কাটলে চোখে জল পড়ে না। অবশ্য তা বাজারে আসেনি। আসলে গবেষণাগারে অনেক কিছুই তৈরী করা হয়, কিন্তু তার সমস্তই বাণিজ্যিক ভাবে তৈরী করা সম্ভব হয়না। দেখা যায় তাতে যা খরচ পড়বে, তা দিয়ে ব্যাবসা করে লাভ হবে না।
তবে কি জানিস, এই যে চোখের ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি, এটা আমাদের চোখকে ভিজিয়ে রাখতে সাহায্য করে। আজকাল স্মার্টফোন আর কম্পিউটারের সামনে অতিরিক্ত চোখ রাখার ফলে অনেকের চোখের জল শুকিয়ে যাচ্ছে আর তার ফলে চোখের নানা রকম অসুখ দেখা দিচ্ছে। তাছাড়াও এই ল্যাক্রিমাল গ্রন্থির ক্ষরণের ফলে চোখের মধ্যে পড়া জীবাণু গুলো বিনষ্ট হয় বা ধুয়ে যায়। যা চোখের সংক্রমণ রোধ করে, চোখ ভাল থাকে। তাই বিজ্ঞানীরা বলছে, পেঁয়াজ কাটার ফলে যে চোখ দিয়ে জল ঝরে এটা ভাল। কোন ক্ষতি নেই এতে।’



সবুজপাতা পত্রিকার ১৪২৫ সনের গ্রীষ্ম ও শরৎ যুগ্ম সংখ্যায় প্রকাশিত